নিরাপত্তা শঙ্কা ও লজ্জায় শুধু মুক্তিবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণে রাজি হয়নি পাকিস্তান

Date: 2025-12-16
news-banner

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর সকাল। মুক্তিবাহিনী ও মিত্র ভারতীয় বাহিনী ঢাকার মিরপুর ব্রিজে এসে পৌঁছায়। সেখান থেকেই পাকিস্তানি বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল এ এ কে নিয়াজির কাছে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়ে একটি চিঠি পাঠানো হয়। তখন ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে চলছিল পাকিস্তানি বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক। দীর্ঘ আলোচনা শেষে অবশেষে তারা আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়।


এই সিদ্ধান্তের জবাব হিসেবে জেনারেল জামসেদকে দিয়ে আত্মসমর্পণের সম্মতির বার্তা পাঠানো হয়। পরে আত্মসমর্পণের শর্তাবলি নিয়ে আলোচনা করতে ভারতীয় ও মুক্তিবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে প্রবেশ করেন। কয়েক ঘণ্টাব্যাপী এই আলোচনা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উত্তেজনাপূর্ণ।


পাকিস্তানি বাহিনীর আশা ছিল, আত্মসমর্পণের দলিলটি যুক্তরাষ্ট্রের কনসাল জেনারেলকে দেওয়া যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবের আদলে হবে। তবে বাস্তবে তা হয়নি। সাবেক আমলা হাসান জহির তার বই ‘সেপারেশন অব ইস্ট পাকিস্তান’-এ লিখেছেন, পাকিস্তানিরা আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল ‘আত্মসমর্পণ’ শব্দটি এড়িয়ে যেতে।


অন্যদিকে, ভারতীয় সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ জে এফ আর জ্যাকব তার বই ‘সারেন্ডার অ্যাট ঢাকা’-তে উল্লেখ করেন, আত্মসমর্পণ দলিলের খসড়া তিনিই প্রস্তুত করেছিলেন।


এম এ জি ওসমানী ও এ কে খন্দকারকে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত রাখার জন্য অধস্তনদের নির্দেশ দেওয়া হলেও জেনারেল নিয়াজি বাঙালিদের কাছে সরাসরি আত্মসমর্পণে রাজি ছিলেন না। শিক্ষাবিদ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এর কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, পাকিস্তানি বাহিনী দুটি কারণে বিষয়টি মানতে চায়নি। প্রথমত, তারা আশঙ্কা করেছিল—বাঙালিদের কাছে পরাজয় স্বীকার করলে জনরোষে পড়ে দেশে ফিরতে পারবে না। দ্বিতীয়ত, মুক্তিবাহিনীর কাছে পরাজয়কে তারা চরম লজ্জাজনক ও মানসম্মানহানিকর বলে মনে করেছিল।


অবশেষে আত্মসমর্পণের দলিল চূড়ান্ত হলে দুই পক্ষের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যান। ঢাকা ক্লাব থেকে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের জন্য আনা হয় একটি সাদামাটা টেবিল ও কয়েকটি চেয়ার।


‘ইন্সট্রুমেন্ট অব সারেন্ডার’ শীর্ষক দলিলে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়—বাংলাদেশে অবস্থানরত পাকিস্তানের সেনা, নৌ, বিমান বাহিনীসহ সব আধাসামরিক ও বেসামরিক সশস্ত্র বাহিনী ভারতীয় ও বাংলাদেশ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করবে। যেখানেই অবস্থান করুক না কেন, সবাইকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার অধীনস্থ নিকটবর্তী বাহিনীর কাছে অস্ত্র জমা দিতে হবে।


দলিলে স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানসহ পুরো ঢাকায় আনন্দের জোয়ার বয়ে যায়। লাখো মানুষের উল্লাস, হাসি আর কান্নায় ভরে ওঠে বিজয়ের প্রান্তর।

বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহবুব জামান স্মৃতিচারণ করে বলেন, “অল্প সময়ের নোটিশে আত্মসমর্পণ করানোই ছিল আমাদের বড় দায়িত্ব। এ কে খন্দকার ছিলেন, আমাদের কমান্ডার কর্নেল হায়দার ছিলেন। তিনি বীরদর্পে হেঁটে যাচ্ছিলেন। আলোচনার সময় পাকিস্তানিরা বলেছিল—‘উই ক্যান অনলি স্যারেন্ডার টু অ্যান অফিসিয়াল আর্মি।’ খোলা আকাশের নিচে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আত্মসমর্পণ করানোই আমাদের গৌরব।”


পরবর্তীতে ১৯ ডিসেম্বর ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের গলফ মাঠে পাকিস্তানি বাহিনীর সদস্যরা আনুষ্ঠানিকভাবে অস্ত্র জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ সম্পন্ন করে।

বিজয়ের সেই দিনে ঢাকা শহরের মানুষ একসঙ্গে হাসছিল, আবার কাঁদছিলও। সেই হাসি-কান্নার পেছনে ছিল অগণিত শহীদের রক্ত, ত্যাগ আর নয় মাসের দীর্ঘ সংগ্রাম। ১৬ ডিসেম্বর তাই শুধু একটি দিন নয়—এটি বাঙালির চূড়ান্ত মুক্তি ও স্বাধীনতার অনন্য দলিল।

Leave Your Comments