ঈদে তোলা ছবিটি নুরুজ্জামানের পারিবারিক সুখস্মৃতির সবশেষ স্মারক, হারিয়েছেন স্ত্রী-সন্তান

Date: 2026-03-26
news-banner

নিজস্ব প্রতিবেদক:

স্বজনদের সৌজন্যে পাওয়া একটি ছবিতে দেখা যায়, চার বছর বয়সী মেয়ে নওয়ারা আক্তারকে কোলে নিয়ে আছেন নুরুজ্জামান। নওয়ারার কানে গোঁজা লাল রঙের ফুল। পাশে দাঁড়ানো স্ত্রী আয়েশা আক্তারের কোলে ৭ মাসের ছেলে আরশান। ঈদে তোলা এই ছবিটিই এখন নুরুজ্জামানের কাছে পারিবারিক সুখস্মৃতির শেষ স্মারক।

বুধবার (২৫ মার্চ) পদ্মা নদীতে স্ত্রী ও পুত্র সন্তানকে হারিয়েছেন নুরুজ্জামান। তারা ছিলেন তলিয়ে যাওয়া সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসটিতে। মেয়েকে নিয়ে নুরুজ্জামান গিয়েছিলেন চিপস কিনতে। ঘাটে ফিরে জানতে পারেন, তার স্ত্রী-সন্তানসহ অন্য যাত্রীদের নিয়ে বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পানিতে পড়ে তলিয়ে গেছে। ঈদ উদযাপন শেষে ঝিনাইদহের শৈলকুপা থেকে ঢাকায় ফেরার পথে নুরুজ্জামানের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে।

শৈলকুপায় নুরুজ্জামানদের বাড়ি কাঁচেরকোল ইউনিয়নের খন্দকারবাড়িয়া গ্রামে। বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) সকালে সেখানে ছিল নিস্তব্ধতা। নুরুজ্জামানের বাবা কামরুজ্জামান প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন ঢাকার সাভারের নয়ারহাটে যাওয়ার। আয়েশার বাবার বাড়ি সাভারে। সেখানে ছেলেসহ তাকে দাফন করা হবে।

কামরুজ্জামান জানান, সাভার ও মিরপুর সিআরপি হাসপাতালে চাকরি করতেন আয়েশা-নুরুজ্জামান দম্পতি। সন্তানদের নিয়ে ঈদের কয়েকদিন আগে বাড়ি ফেরেন। বুধবার দুপুরে কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন তারা।

নাতি-নাতনিকে বিদায় দেওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর বিকেলে মোবাইল ফোনে নুরুজ্জামানের কল পান কামরুজ্জামান। ওপাশ থেকে কাঁদতে কাঁদতে ছেলে জানান, ‘আব্বা, আমার সব শেষ। আপনার বৌমা আর আরশান পদ্মায় তলিয়ে গেছে।’

কামরুজ্জামানের সঙ্গে ওই ফোনালাপের সময়ই চিপস কিনতে গিয়ে নিজে বেঁচে যাওয়ার কথাও জানান নুরুজ্জামান। ঘাটে দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর রাত তিনটার দিকে বাসের ভেতর থেকে তার স্ত্রী ও পুত্র সন্তানের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

প্রতি বছর ঈদের ছুটিতে নুরুজ্জামানের গ্রামের বাড়িতে বিনামূল্যে মেডিকেল ক্যাম্প বসত। তার ভাতিজা মোবাস্বির আহমেদ বলেন, চাচা-চাচি মিলে এ কাজ করতেন। তবে এবার নিজেদের অসুস্থতার কারণে ক্যাম্পটি করা সম্ভব হয়নি।

ঢাকায় রওনা হওয়ার আগে গত মঙ্গলবার রাতে আত্মীয় বুলবুল আহমেদের সঙ্গে কথা হয়েছিল নুরুজ্জামানের। তিনি বলেছিলেন, ‘ভাগনে, আগামীকাল (বুধবার) চলে যাচ্ছি, দেখা হবে না।’ বুলবুল বলেন, সেটি ছিল বিদায়ের আগে সৌজন্য সাক্ষাৎ। কয়েক ঘণ্টা পর এমন হৃদয়বিদারক ঘটনার খবর শুনতে হবে, তা কল্পনাও করেননি।

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে তলিয়ে যাওয়া বাসটি বৃহস্পতিবার উদ্ধার করা হয়েছে। আয়েশা ও আরশানসহ ২৬ জনের মরদেহ শনাক্ত করা হয়েছে।

Leave Your Comments