পটুয়াখালীতে দন্ত চিকিৎসার নামে অপচিকিৎসা: মৃত্যুর অভিযোগ

Date: 2026-05-05
news-banner

আব্দুল কাইয়ুম আরজু, পটুয়াখালী প্রতিনিধি:

প্রান্তিক জনপদে আধুনিক স্বাস্থ্যসেবার ছোঁয়া পৌঁছানোর কথা থাকলেও বাস্তবে সেখানে বেড়েই চলেছে অপচিকিৎসা, প্রতারণা ও অনিয়মের অভিযোগ। 

পটুয়াখালীর মহিপুর থানা এলাকায় ‘এশিয়া ডেন্টাল কেয়ার’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে উঠেছে গুরুতর অভিযোগ। ভুল চিকিৎসার কারণে এক রোগীর মৃত্যুসহ একাধিক ভুক্তভোগীর দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক ক্ষতির দাবি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ‘এশিয়া ডেন্টাল কেয়ার’ নামের এই অপচিকিৎসালয় দীর্ঘদিন ধরে অপেশাদার ও অননুমোদিত চিকিৎসা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। একাধিক ভুক্তভোগী ভুল চিকিৎসার শিকার হলেও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের দৃশ্যমান স্থায়ী কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেই বলে দাবি এলাকাবাসীর।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কথিত দন্ত চিকিৎসক ডা. হারুন এর বিরুদ্ধে অতীতে ভুয়া চিকিৎসা দেওয়ার অভিযোগে কারাভোগের তথ্য রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, জেল থেকে বের হয়ে তিনি পুনরায় একই ধরনের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। এতে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

এছাড়া তার ভাই আব্দুল হাকিম কলাপাড়ায় দন্ত চিকিৎসক এবং মহিপুরে নিজেকে চক্ষু বিশেষজ্ঞ পরিচয় দিয়ে চিকিৎসা দিয়ে আসছেন। আরও অভিযোগ রয়েছে— ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে এই ভূয়া চক্ষু বিশেষজ্ঞই হাতুড়ি-বাটাল নিয়ে রোগীদের দাঁতের চিকিৎসা করান, যা আইনি ও নৈতিকভাবে গুরুতর অপরাধ।

সরেজমিনে তদন্তে বেরিয়ে এসেছে লোমহর্ষক সব তথ্য:
জনৈক এক ভুক্তভোগীর প্রতিবেশী জানান, ভুল চিকিৎসার কারণে দাঁতে মারাত্মক ইনফেকশন হয়ে পচন ধরে, পরে অর্থের অভাবে উন্নত চিকিৎসা করাতে না পেরে ওই রোগী মৃত্যুবরণ করেন। একই অভিযোগ করেন কুয়াকাটার আরেক ভুক্তভোগী। তিনি জানান, ওই ডাক্তারের কাছ থেকে চিকিৎসা নেওয়ার পর দাঁতে ইনফেকশন হয়। পরে তিনি উন্নত চিকিৎসায় সুস্থ হয়।
এক ভুক্তভোগী জানান, ব্যথানাশক ইনজেকশন ছাড়াই বাটাল দিয়ে তার সুস্থ দাঁত তুলে ফেলা হয়েছে। শুধু তাই নয়, দন্ত চিকিৎসকের বদলে তার দাঁত তুলেছেন ভূয়া চক্ষু বিশেষজ্ঞ পরিচয় দেওয়া আঃ হাকিম, যা ছিল অত্যন্ত অমানবিক ও ঝুঁকিপূর্ণ। এনিয়ে এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।

আরেকজন বলেন, এই প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নেওয়া অধিকাংশ মানুষই পরবর্তীতে জটিলতায় ভুগছেন। এমনকি এক পর্যায়ে ক্ষুব্ধ জনতা অভিযুক্ত চিকিৎসককে মারধরও করেন।
এক নারী ভুক্তভোগীর বাবা জানান, একটি দাঁত তোলার কথা থাকলেও তার মেয়ের তিনটি দাঁত তুলে ফেলা হয়—যা মেয়েটিকে দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক সমস্যায় ফেলেছে।
আরেকজন জানান, একটি দাঁতে ক্যাপ বসানোর কথা থাকলেও দুটি দাঁতে ক্যাপ বসানো হয়, যার ফলে তিনি তীব্র ব্যথায় ভুগছেন এবং রাতে ঘুমাতে পারছেন না।

এতসব গুরুতর অভিযোগ থাকার পরেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে স্থায়ী কোনো আইনগত ব্যবস্থা না নেওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। প্রশ্ন উঠছে, স্বাস্থ্যখাতে নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকারিতা কোথায়?
ক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দারা​ দ্রুত এই অপ-চিকিৎসকদের গ্রেফতার দাবি করে বলেন, একজন ভুয়া ডাক্তারের কারণে মানুষের জীবন বিপন্ন হবে, আর আইন প্রশাসন নীরব থাকবে, এটা মেনে নেওয়া যায় না। 

এমন লোমহর্ষক ঘটনার পরও বীরদর্পে চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছেন এই চক্র। স্বল্পমূল্যের চিকিৎসার আশায় নিম্নআয়ের মানুষ এসব প্রতিষ্ঠানের শরণাপন্ন হলেও স্থায়ীভাবে শারীরিক সক্ষমতা হারাচ্ছেন। এতে একদিকে যেমন বাড়ছে দীর্ঘ মেয়াদে শারীরিক ক্ষতি, অন্যদিকে আইন ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা কমছে।

ভুক্তভোগী ও স্থানীয়দের দাবি, অভিযুক্ত ভুয়া চিকিৎসকদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে। প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করে যথাযথ তদন্ত চালাতে হবে, এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে। প্রান্তিক এলাকায় স্বাস্থ্যসেবার ওপর কঠোর নজরদারি জোরদার করতে হবে।

এ বিষয়ে জানতে কলাপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। এমনকি খুদেবার্তা (হোয়াটসঅ্যাপ) পাঠিয়েও তার কোনো সাড়া মেলেনি।

​কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. কাউছার হামিদ জানান, আমি বর্তমানে ছুটিতে আছি। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মহোদয় বিষয়টি আমাকে জানিয়েছেন। কর্মস্থলে ফিরে আমি এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে সহায়তা করতে পারব।

​পটুয়াখালী জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মাদ খালেদুর রহমান মিয়া বলেন, "বিষয়টি আমি প্রশাসনকে অবহিত করেছি। তারা দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে আশ্বস্ত করেছেন।"

মহিপুরের এই ঘটনা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম নয়—এটি প্রান্তিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার গভীর সংকটের এক বাস্তব চিত্র। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এ ধরনের অপচিকিৎসা আরও বিস্তৃত হয়ে সাধারণ মানুষের জীবনকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলবে।

Leave Your Comments