নোয়াখালী-ঢাকা সংযোগে আলোচিত এক প্রতারণার তদন্তচিত্র
নিজস্ব অনুসন্ধান |
একটি পারিবারিক সম্পর্ক কীভাবে ধীরে ধীরে প্রতারণা, আইনি জটিলতা এবং ফৌজদারি অভিযোগে রূপ নিতে পারে তারই এক আলোচিত চিত্র উঠে এসেছে নোয়াখালী ও ঢাকাকে কেন্দ্র করে সংঘটিত একটি ঘটনায়। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, বৈধ তালাক ছাড়াই এক বিবাহিত নারীকে দ্বিতীয়বার বিয়ে রেজিস্ট্রির অভিযোগ, যেখানে প্রশ্নের মুখে একজন ব্যবসায়ী, একজন নিকাহ রেজিস্ট্রার এবং সংশ্লিষ্ট নারীর সিদ্ধান্ত।
তদন্ত সূত্র জানায়, প্রায় দুই দশক আগে মোঃ আওলাদ হোসেন ও মরিয়ম বিবি (নয়ন)-এর মধ্যে শরিয়ত ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়। দীর্ঘ সংসারজীবনে তাদের চার সন্তান রয়েছে।
পরিবারিক পরিচয়ের সূত্র ধরে একপর্যায়ে পরিচয় হয় ঢাকার আজিমপুর এলাকার ব্যবসায়ী কবির আহম্মেদের সঙ্গে। দুই পরিবারের মধ্যে নিয়মিত যাতায়াত ও ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। সেই সম্পর্কের সূত্র ধরেই ঘটনার মোড় ঘুরতে শুরু করে।
ফ্ল্যাটের প্রতিশ্রুতি, এরপর গোপন বিয়ে
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে কবির আহম্মেদ মরিয়ম বিবিকে নিজের নামে একটি ফ্ল্যাট লিখে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে বিয়ের প্রস্তাব দেন। অভিযোগ রয়েছে, এই প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতেই মরিয়ম বিবি ঢাকার একটি কাজী অফিসে গিয়ে তার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
সেখানে কাজী মোঃ আলী মিয়া এক লক্ষ টাকা দেনমোহর নির্ধারণ করে তাদের নিকাহ রেজিস্ট্রি করেন বলে নথিপত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়।
বিয়ের পর মরিয়ম বিবি ঢাকার কামরাঙ্গীরচর এলাকায় কবির আহম্মেদের সঙ্গে স্বামী-স্ত্রীর মতো বসবাস শুরু করেন।
তবে সম্পর্কের এই অধ্যায় বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। তদন্তে জানা যায়, প্রতিশ্রুত ফ্ল্যাট হস্তান্তর না হওয়ায় তাদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। মাত্র ১৪ দিনের মাথায় একই কাজী অফিসে “খোলা তালাক”-এর মাধ্যমে তাদের বিচ্ছেদের নথি সম্পন্ন করা হয়।
মূল প্রশ্ন: প্রথম স্বামীকে কি আইনগত তালাক দেওয়া হয়েছিল?
এই মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখানেই।
তদন্তে পাওয়া নথি ও সাক্ষ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মরিয়ম বিবির প্রথম স্বামী মোঃ আওলাদ হোসেনের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক আইনগতভাবে বহাল ছিল কি না, তা যাচাই ছাড়াই দ্বিতীয় বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
কাজী অফিস থেকে তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে পাঠানো ব্যাখ্যায় দাবি করা হয়, মরিয়ম বিবি পূর্বে তার প্রথম স্বামীর কাছ থেকে মৌখিক তিন তালাক পেয়েছিলেন, এবং একটি মাদ্রাসা থেকে ফতোয়া নিয়ে দ্বিতীয় বিবাহে সম্মত হন।
কিন্তু তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের প্রচলিত পারিবারিক আইন অনুযায়ী কেবল মৌখিক তালাক যথেষ্ট নয়। তালাক কার্যকর হতে হলে লিখিত তালাকনামা, নির্ধারিত নোটিশ এবং আইনগত রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া বাধ্যতামূলক।
এই প্রেক্ষাপটে তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রাথমিকভাবে মত দিয়েছেন প্রথম বৈবাহিক সম্পর্ক বহাল থাকা অবস্থায় দ্বিতীয় বিবাহ সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে না , যা ফৌজদারি অপরাধের উপাদান সৃষ্টি করে।
তদন্তে প্রাথমিকভাবে যা উঠে এসেছে,
নথি, সাক্ষ্য, নিকাহনামা, তালাকনামা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পর্যালোচনায় তদন্তে প্রাথমিকভাবে উঠে এসেছে
মরিয়ম বিবি বৈধ তালাক সম্পন্ন না করেই দ্বিতীয় বিবাহে আবদ্ধ হয়েছেন এমন অভিযোগের ভিত্তি পাওয়া গেছে।
কবির আহম্মেদ একজন বিবাহিত নারীকে প্রলোভন দেখিয়ে বিবাহে আবদ্ধ করেছেন, এমন অভিযোগেরও সত্যতা পাওয়া গেছে।
কাজী মোঃ আলী মিয়া অতিরিক্ত টাকা নিয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত যাচাই-বাছাই ছাড়াই নিকাহ রেজিস্ট্রি করে দায়িত্বে অবহেলা বা সহায়তার অভিযোগে প্রশ্নের মুখে পড়েছেন।
তদন্তে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির একাধিক ধারায় অপরাধের প্রাথমিক উপাদান পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে।
বাদীপক্ষের আরজিতে আরও কয়েকটি অভিযোগ আনা হয়েছিল, যার মধ্যে ছিল।
৭০ হাজার টাকা আত্মসাৎ
প্রায় ৩ ভরি স্বর্ণালংকার নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ
শারীরিক নির্যাতন
ভয়ভীতি ও হুমকি প্রদান
তবে তদন্তে এসব অভিযোগের পক্ষে প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য, চিকিৎসা নথি কিংবা বস্তুগত আলামত পাওয়া যায়নি। ফলে এসব অভিযোগ আপাতত অপ্রমাণিত হিসেবে বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
এই ঘটনার পর নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে!
একজন মুসলিম ম্যারেজ রেজিস্ট্রার বা কাজী কি শুধুমাত্র মৌখিক দাবি, ব্যক্তিগত বক্তব্য কিংবা ধর্মীয় ব্যাখ্যার ভিত্তিতে দ্বিতীয় বিয়ে রেজিস্ট্রি করতে পারেন? নাকি পূর্বের বৈবাহিক সম্পর্ক ও তালাকের আইনগত নথি যাচাই করা তার বাধ্যতামূলক দায়িত্ব?
নোয়াখালী ও ঢাকাজুড়ে আলোচিত এই ঘটনাটি এখন আইনি প্রক্রিয়ার অপেক্ষায়। তদন্তে প্রাথমিক সত্যতা উঠে এলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন আদালত।
তবে ঘটনাটি আবারও স্পষ্ট করেছে বিবাহ, তালাক ও পুনর্বিবাহের ক্ষেত্রে আইনগত প্রক্রিয়া উপেক্ষা করলে তা শুধু পারিবারিক বিরোধে সীমাবদ্ধ থাকে না, একসময় তা ফৌজদারি জটিলতায়ও রূপ নিতে পারে।