ধর্ষণ-সহিংসতার বিস্তার: নৈতিক অবক্ষয় ও সামাজিক দায়

Date: 2026-05-21
news-banner

মোঃ মাইন উদ্দিন :

সারা দেশজুড়ে আবারও ক্ষোভ, শোক ও প্রতিবাদের ঢেউ। শিশু রামিসাকে নির্মমভাবে হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনায় মানুষ রাস্তায় নেমেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সরব হয়েছে, মানববন্ধন ও সভা-সমাবেশে উচ্চারিত হচ্ছে বিচার ও নিরাপত্তার দাবি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এমন ঘটনা কি সত্যিই আমাদের জন্য নতুন কিছু? নাকি আমরা ধীরে ধীরে এমন ভয়াবহতার সঙ্গেই অভ্যস্ত হয়ে পড়ছি?

বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রতিনিয়ত সংবাদমাধ্যমে উঠে আসছে শিশু ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন ও হত্যার খবর। কখনও বাড়ির আশপাশে, কখনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, কখনও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তাহীনতার এই বৃত্ত যেন ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় হলো, অনেক সময় অপরাধী হিসেবে উঠে আসছে পরিচিত মুখ, বিশ্বাসের মানুষ কিংবা নিকটজন।

একটি শিশু পৃথিবীতে আসে নিরাপদ শৈশব ও ভালোবাসার স্বপ্ন নিয়ে। অথচ আমাদের সমাজে অনেক শিশুই আজ ভয়, অনিরাপত্তা ও সহিংসতার মধ্যে বড় হচ্ছে। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র, এ তিনটি জায়গাতেই যখন দায়িত্ব পালনে ঘাটতি তৈরি হয়, তখন এমন অপরাধ বাড়তেই থাকে। শুধু আইন করলেই হবে না, প্রয়োজন তার কার্যকর প্রয়োগ এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা।

ধর্ষণ ও নারী-শিশু নির্যাতনের পেছনে কেবল ব্যক্তিগত বিকৃতি নয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ও বড় কারণ। পরিবারে নৈতিক শিক্ষার অভাব, মাদকাসক্তি, অপরাধীর রাজনৈতিক বা সামাজিক আশ্রয়, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং নারীর প্রতি বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গি- সবকিছু মিলেই পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তুলছে। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা জানে, কিছুদিন আলোচনা হবে, তারপর ঘটনাটি চাপা পড়ে যাবে। এই মানসিকতা অপরাধকে আরও উৎসাহিত করে।

এ বাস্তবতায় শুধু ক্ষোভ প্রকাশ করলেই চলবে না, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবারকে আরও সচেতন হতে হবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নজরদারি বাড়াতে হবে এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে হবে। একইসঙ্গে অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন অপরাধ করার সাহস না পায়।

একটি সভ্য রাষ্ট্রের পরিচয় তার উন্নত অবকাঠামোতে নয়, বরং শিশু কতটা নিরাপদ তার ওপর নির্ভর করে। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে কোনো শিশুর শৈশব ভয় নিয়ে কাটবে না, কোনো পরিবার সন্তানকে নিয়ে আতঙ্কে থাকবে না এবং মানবিকতা ও ন্যায়বিচারই হবে সমাজের সবচেয়ে বড় শক্তি।

Leave Your Comments