নেত্রকোনায় মগড়া নদী পুনরুদ্ধার ও খনন প্রকল্পের নামে নদীতীরবর্তী বৈধ জমির মালিকদের হয়রানি, উচ্ছেদের হুমকি এবং সরকারি অর্থের অপচয় ও অনিয়মের অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলন করেছেন ভুক্তভোগীরা।
রবিবার (০৮ নভেম্বর ২০২৬) সকালে নেত্রকোনা প্রেসক্লাবে আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে ভুক্তভোগীরা এসব অভিযোগ তুলে ধরেন। তাঁরা বলেন, নদী পুনরুদ্ধারের নামে একটি অসাধু চক্র নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহায়তায় সরকারি বরাদ্দের কোটি কোটি টাকা লুটপাটের পাঁয়তারা করছে। একই সঙ্গে নদীতীরবর্তী বৈধ মালিকানাধীন জমি ও বসতভিটা থেকে সাধারণ মানুষকে উচ্ছেদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ২০২৫ সালে নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মগড়া নদীর সীমানা নির্ধারণ ও পরিমাপের নামে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, নদীতীরবর্তী বসতভিটা ও দোকানপাটে কোনো ধরনের যথাযথ নোটিশ না দিয়ে সিএস নকশা অনুসরণ করে পরিমাপ কার্যক্রম পরিচালনার চেষ্টা করা হয়। এতে ভুক্তভোগী জমির মালিকদের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে।
বক্তারা জানান, গত ২২ মে ২০২৫ তারিখে তাঁরা তৎকালীন জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত আবেদন করেন। পরবর্তীতে বিষয়টি নিয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের (রাজস্ব) সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে উচ্চ আদালতের নির্দেশনার কথা জানানো হয়। তবে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেন, তাঁদের কাছে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো আদালতের নির্দেশনা দেখানো সম্ভব হয়নি।
সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, মগড়া নদী দখল ও দূষণ প্রতিরোধ এবং সীমানা নির্ধারণের বিষয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) সংশ্লিষ্ট রিট পিটিশন নং ৫১৬১/২০২৫ দায়ের করেছে। লিখিত বক্তব্য অনুযায়ী, মামলাটি উচ্চ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। এ অবস্থায় আদালতের নির্দেশনা ও প্রযোজ্য আইন অনুসরণ না করে কোনো উচ্ছেদ বা পরিমাপ কার্যক্রম পরিচালনা করা উচিত নয় বলে দাবি করেন তাঁরা।
বক্তারা বলেন, নদীর সীমানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উত্তর আরএস রেকর্ড, আইনানুগ দলিল, সরকারি নথি এবং আদালতের প্রযোজ্য নির্দেশনা বিবেচনায় নিতে হবে। কোনো নাগরিকের বৈধ মালিকানাধীন সম্পত্তিতে সরকারি কর্তৃপক্ষের প্রবেশ, জরিপ, অধিগ্রহণ কিংবা উচ্ছেদের কার্যক্রম অবশ্যই আইনানুগ প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন করতে হবে। জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে।
লিখিত বক্তব্যে মগড়া নদী খনন প্রকল্পের পরিকল্পনা ও ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। তাঁদের দাবি, মগড়া নদীর দৈর্ঘ্য প্রায় ১৫৫ কিলোমিটার হলেও প্রকল্পে মাত্র ৪১ কিলোমিটার খননের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে নদীর উজান-ভাটির স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ, পলি জমার প্রবণতা এবং প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এ ছাড়া নদীর তীরবর্তী এলাকায় ওয়াকওয়ে নির্মাণ, খননের স্থান ও গভীরতা নির্ধারণ, প্রকল্পের ব্যয় এবং সম্ভাব্য পরিবেশগত প্রভাব নিয়েও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান তাঁরা। প্রকল্পের ডিপিপি, অনুমোদিত নকশা, দরপত্র, কার্যাদেশ, অর্থায়নের উৎস, খননের পরিমাণ এবং ব্যয়ের হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশের আহ্বান জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—নদীতীরবর্তী বৈধ জমি ও বসতভিটায় আইনানুগ প্রক্রিয়া ছাড়া কোনো ধরনের জরিপ, পরিমাপ বা উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা না করা; নদীর সীমানা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সব ভূমি রেকর্ড ও আদালতের নির্দেশনা যাচাই করা; মগড়া নদীসংক্রান্ত রিট পিটিশনের আদেশ ও সংশ্লিষ্ট নির্দেশনার সত্যায়িত অনুলিপি প্রকাশ করা; প্রকল্পের ব্যয় ও কারিগরি পরিকল্পনা স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে পর্যালোচনা করা এবং কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি হয়ে থাকলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
বক্তারা আরও বলেন, নদী পুনরুদ্ধার ও পরিবেশ রক্ষা অবশ্যই প্রয়োজন। তবে সেই উদ্যোগের আড়ালে সাধারণ মানুষের বৈধ সম্পত্তির অধিকার ক্ষুণ্ন করা যাবে না। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, আইনের শাসন ও জনস্বার্থ নিশ্চিত করেই মগড়া নদী পুনরুদ্ধার প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ভুক্তভোগীদের বক্তব্য ও দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।