ভাবছিলাম, এ বিষয়ে কিছু লিখব না। কারণ আমার ফ্রেন্ডলিস্টে দেশ-বিদেশের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ রয়েছেন। কোনো বিষয় কারও ভালো লাগতে পারে, আবার কারও কাছে ভালো নাও লাগতে পারে। কিন্তু বিবেক এবং সুস্থ চিন্তা দিয়ে বিষয়টি একবার ভেবে দেখলে হয়তো আমাদের সবারই কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। কয়েকদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে এক নারীকে গলায় ফুলের মালা পরিয়ে রাস্তায় এবং বাড়ি বাড়ি ঘুরিয়ে সংবর্ধনা দিতে দেখা যাচ্ছে। কিশোরগঞ্জসহ আশপাশের কয়েক জেলার ফেসবুক ব্যবহারকারীদের নিউজফিডে ভিডিওটি কমবেশি সবার চোখেই পড়েছে। তাই দেশ ও দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্বার্থে বিষয়টি নিয়ে কিছু কথা না বলে পারলাম না।
ভিডিও ও স্থানীয়ভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার কালিকাপ্রসাদ ইউনিয়নের আকবরনগর-মিরারচর বাসস্ট্যান্ড বাজারের নামকরণকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ওই সংঘর্ষে দেশীয় অস্ত্র হাতে এক নারীকে অংশ নিতে দেখা গেছে ভিডিওতে। সংঘর্ষে মিরারচর পক্ষের লোকও নিহত হয়েছে। এসব ঘটনায় মামলা হয়। পরে ওই নারীকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয় এবং কিছুদিন পর তিনি জামিনে মুক্তি পান। আর জামিনে মুক্তির পর এলাকাবাসীর একটি অংশ তাকে ফুল দিয়ে বরণ করে নেয় এবং বিভিন্ন সড়ক ও বাড়ি বড়ি ঘুরিয়ে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। ঝগড়ায় অংশগ্রহণ করায় স্থানীয়ভাবে তাকে ‘বাঘেনী কন্যা’ নামেও অভিহিত করা হয়েছে।
তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি- কোনো মামলায় গ্রেফতার বা আসামি হওয়া মানেই আদালতের বিচারে অপরাধী সাব্যস্ত হওয়া নয়। একইভাবে জামিনও নির্দোষ প্রমাণের সনদ নয়। মামলার সত্য-মিথ্যা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দায় আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে।
কিন্তু প্রশ্নটা অন্য জায়গায়। যে সংঘর্ষে মানুষ প্রাণ হারালেন, মামলা হলো, গ্রেফতার হলো, সেই মামলার একজন আসামি জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর তাকে ফুলের মালা পরিয়ে প্রকাশ্যে সংবর্ধনা দেওয়ার মধ্য দিয়ে আমরা সমাজকে কি বার্তা দিচ্ছি? এটি কি ভবিষ্যতে সংঘর্ষ, সহিংসতা কিংবা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতাকে কোনোভাবে উৎসাহিত করছে না? একজন নারী যদি কোনো সংঘর্ষে অংশ নেওয়ার অভিযোগে আলোচনায় আসেন, তাহলে তাকে ‘বীরত্বের প্রতীক’ হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা আমাদের নতুন প্রজন্মের জন্য কি শিক্ষা তৈরি করবে?
ফুলের মালা সম্মান ও গৌরবের প্রতীক। সাধারণত মানুষ কোনো ভালো কাজ করলে, বিশেষ কিছু অর্জন করলে, সাফল্য কিংবা সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ফুল দিয়ে বরণ করে। কিন্তু কোনো সংঘর্ষের ঘটনায় মামলা ও প্রাণহানির পর সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে জামিনে মুক্তি পাওয়ার কারণে এভাবে সংবর্ধনা দেওয়া হলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে- আমরা আসলে কাকে বরণ করছি, কেন বরণ করছি এবং কিসের জন্য বরণ করছি? আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এই আয়োজনে শিশু থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সী মানুষকে অংশ নিতে দেখা গেছে। এখান থেকে তারা কি শিখছে? আমরা তাদের কি শেখাচ্ছি?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এ ঘটনায় নিহত হয়েছেন। পরিবার তার প্রিয়জনকে হারিয়েছে। সেই পরিবারের শোক, কষ্ট ও অসহায়ত্বের কথা কি আমরা একটিবার ভাবছি? আমাদের আনন্দ-উল্লাস কি সেই পরিবারের ক্ষতকে আরও গভীর করে না? আইন ও আদালতের প্রতি শ্রদ্ধা থাকা একটি সভ্য সমাজের অন্যতম প্রধান শর্ত। কেউ অভিযুক্ত হলে তার বিচার হবে, নির্দোষ হলে মুক্তি পাবেন, আর দোষী সাব্যস্ত হলে আইন অনুযায়ী সাজা হবে এটাই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু আদালতের রায়ের আগেই কোনো পক্ষকে নায়ক বানিয়ে ফেলা কিংবা সংঘর্ষকে বীরত্বের সঙ্গে যুক্ত করা অত্যন্ত বিপজ্জনক সামাজিক প্রবণতা।
আমরা প্রায়ই বলি, দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি দরকার। অথচ একই সঙ্গে যদি সংঘর্ষ ও সহিংসতার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠা কাউকে সামাজিকভাবে বীরের মর্যাদা দেওয়া হয়, তাহলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার বার্তাটি কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়? অপরাধের বিচার শুধু আদালতে নয়, সমাজের মূল্যবোধেও হতে হয়। অন্তত আমাদের সামাজিক আচরণে যেন অপরাধ বা সহিংসতার কোনো রকম মহিমান্বিতকরণ না থাকে। কারণ আজ একজনকে ফুল দিয়ে বরণ করা হচ্ছে, কাল হয়তো অন্য কেউ একই ধরনের ঘটনায় আরও উৎসাহিত হতে পারে।
আমি কাউকে অপরাধী বলছি না, কারও বিরুদ্ধে রায়ও দিচ্ছি না। কেননা, বিচার করার দায়িত্ব আদালতের। আমি শুধু সমাজের বিবেকের কাছে কয়েকটি প্রশ্ন রাখছি- সহিংসতা কি আমাদের কাছে গৌরবের বিষয় হয়ে উঠছে? মামলা থেকে জামিনে বের হওয়া কি এখন সংবর্ধনার কারণ হতে শুরু করেছে? কারোর মৃত্যু কি আমাদের বিবেককে নাড়া দিবে না? আর আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কি শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছি?
ভাইরাল সেই ভিডিও হয়তো একদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিড়ে হারিয়ে যাবে। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে যে সামাজিক বার্তা ছড়িয়ে পড়ল, সেটিই সবচেয়ে উদ্বেগের। তাই বিষয়টি নিয়ে লেখা কারও বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়, বরং আমাদের নিজেদের বিবেককে প্রশ্ন করা। আমরা কি এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে সংঘর্ষের পর অভিযুক্ত হয়ে কারাগারবাসের পর জামিনে মুক্ত হলে ফুলের মালা জোটবে, নাকি এমন একটি সমাজ চাই যেখানে মানুষ সংঘর্ষ এড়িয়ে আইন ও আদালতের ওপর আস্থা রাখে? উত্তরটি শুধু ওই এলাকা বা কোনো নির্দিষ্ট এলাকার মানুষের জন্য নয়- আমাদের সবার বিবেকের কাছে।