প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে গিয়ে বরিশালের হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জে বাধার মুখে পড়ছে প্রশাসন। মেঘনা নদীতে অভিযান চালাতে গিয়ে মৎস্য বিভাগ, কোস্ট গার্ড ও পুলিশের সদস্যদের ওপর হামলার একাধিক অভিযোগ উঠেছে।
অভিযানে অংশ নেওয়া সদস্যদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল, টেঁটা ও আগুনের গোলা নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে একপর্যায়ে কোস্ট গার্ডকে ১১ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়তে হয়।
অন্যদিকে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে নদীতে ইলিশ শিকার ও বিভিন্ন মাছঘাটে প্রকাশ্যে বিক্রি চলছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে স্থানীয় কয়েকজন বিএনপি নেতার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও উঠেছে। তবে অভিযোগগুলোর স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা যায়নি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, অভিযানে বাধা, হামলা ও জনবলসংকটের কারণে মা ইলিশ রক্ষার কার্যক্রম কঠিন হয়ে পড়েছে।
অভিযানে হামলার অভিযোগঃ
স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ৮ অক্টোবর থেকে হিজলার মেঘনা নদীর তীরবর্তী কয়েকটি মাছঘাটে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ইলিশ বিক্রি শুরু হয়।
হরিনাথপুর ইউনিয়নের টুমচর নদীর কিনারায় বেবাজিয়া পাড়া, আবুপুর লঞ্চঘাট, নাচকাঠী, গৌরবদী ইউনিয়নের কাঁকুড়িয়া, অন্তর্বাম, চরকিল্লা ও জানপুর এলাকায় মাছ শিকার ও বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। মেমানিয়া ইউনিয়নের টেকেরহাট বাজারেও ইলিশ বিক্রি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
অভিযোগ রয়েছে, এসব ঘাটে মাছ বিক্রির সঙ্গে স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত। শরীয়তপুরের কিছু মাছ ব্যবসায়ী এসব ঘাটে এসে মাছ কেনাবেচা করেন। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় কয়েকজন বিএনপি নেতাকে বিক্রির অর্থের একটি অংশ দিতে হয় বলেও অভিযোগ করেছেন একাধিক জেলে। তাঁদের দাবি, প্রতিটি ঘাট থেকে প্রতিদিন দুই হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
ইটপাটকেল, টেঁটা ও আগুনের গোলাঃ
স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জে মেঘনা নদীতে ইলিশ রক্ষায় অভিযান চালাতে গেলে বিভিন্ন সময়ে বাধা ও হামলার ঘটনা ঘটছে। অভিযানে অংশ নেওয়া দলকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল, বাঁশ ও টেঁটা নিক্ষেপের পাশাপাশি সুতা দিয়ে তৈরি আগুনের গোলা ছোড়ার অভিযোগও রয়েছে।
গত শনিবার বিকেলে মূল মেঘনা নদীতে মৎস্য বিভাগ, কোস্ট গার্ড ও নৌ পুলিশের যৌথ দল ইলিশ শিকারে ব্যবহৃত ছয়টি ফিশিং বোট দেখতে পায়। বোটগুলোকে ধাওয়া করে জাল উদ্ধারের চেষ্টা করা হলে ছয়টি ট্রলারে থাকা শতাধিক জেলে একজোট হয়ে অভিযানে অংশ নেওয়া দলের ওপর হামলা চালান বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এর আগের দিন শুক্রবার বিকেলে হিজলার অন্তর্বাম এলাকায় মূল মেঘনা নদীতে অভিযানে গিয়ে প্রশাসন, পুলিশ ও কোস্ট গার্ডের সদস্যরা হামলার শিকার হন। ইটপাটকেলের আঘাতে কয়েকজন আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কোস্ট গার্ড ১১ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
‘অভিযানে গেলেই হামলা’
হিজলা উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান বলেন, অভিযানের শুরু থেকেই বিভিন্নভাবে বাধা ও হামলার মুখে পড়তে হচ্ছে। দেশীয় অস্ত্র নিয়ে জেলেরা নদীতে ইলিশ শিকারে যাচ্ছেন। বড় ট্রলারে অনেক জেলে থাকেন। সেখান থেকে আগুনের গোলা ছোড়া হচ্ছে এবং টেঁটা তাক করে রাখা হচ্ছে। বৃষ্টির মতো ইটপাটকেলও নিক্ষেপ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, জেলেদের তুলনায় অভিযানে অংশ নেওয়া সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সংখ্যা অনেক কম। ফলে অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।
মেহেন্দীগঞ্জেও ইলিশ বিক্রির অভিযোগ
মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ উলানিয়া ইউনিয়নের হাজিরহাট বাজারসংলগ্ন মেঘনার শাখা নদীতেও নিষেধাজ্ঞার মধ্যে ইলিশ বিক্রির অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, জেলেরা মাছ ধরে চিকন খালের মুখে নিয়ে আসেন। পরে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সেখানে ক্রেতাদের ভিড় থাকে।
মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, নদীতে অভিযান চালাতে গেলেই হামলার শিকার হতে হচ্ছে। একাধিক দিন এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
এদিকে বরিশাল সদর উপজেলার শায়েস্তাবাদ ইউনিয়নের হবিনগর-ঝুনাহার গ্রামেও নিষেধাজ্ঞা চলাকালে ইলিশ শিকার ও প্রকাশ্যে বিক্রির অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের দাবি, আড়িয়াল খাঁ ও কালাবদর নদসংলগ্ন এলাকায় মাছ ধরা হচ্ছে।
বরিশাল জেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা ড. হাদিউজ্জিমান বলেন, অভিযান শুরুর পর থেকে হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হিজলায় কোস্ট গার্ডকে ফাঁকা গুলি ছুড়তে হয়েছে। রোববারও মেঘনা নদীতে জেলেদের বেপরোয়া আচরণের ঘটনা ঘটেছে বলে তিনি জানান।
মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রাখতে নদীতে নিয়মিত অভিযান, পর্যাপ্ত জনবল এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত তৎপরতা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অবৈধভাবে ইলিশ শিকার ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।