আব্দুল্লাহ আল মামুন (প্রধান প্রতিবেদক):
কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার আড়িয়া ইউনিয়নের ছাতারপাড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সিনিয়র সহকারী শিক্ষক সহিদুল হক (৫৭) কে লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে মারাত্বকভাবে রক্তাক্ত জখম করে একই বিদ্যালয়ের সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী (নিরাপত্তা কর্মী) আশিকুর রহমান। আশিকুর রহমান বিদ্যালয়ের অভিভাবক সদস্য আলিহিমের ছেলে। এ ঘটনার সাথে আলিহিম এবং বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি তহমিদুর রহমানও জড়িত রয়েছেন বলে মামালা সূত্রে জানা যায়।
সূত্রে আরো জানা যায় যে, ঘটনাটি গত ১৮ জুলাই, মঙ্গলবার দুপুরে বিদ্যালয়ের অফিস কক্ষে ঘটানো হয়েছে। এদিন বিদ্যালয়ে অভিভাবক সমাবেশ শেষে সহকারী শিক্ষক সহিদুল হক অফিস কক্ষে প্রধান শিক্ষক মো. রিয়াজুল ইসলামসহ অন্যান্য শিক্ষদের সাথে বসা ছিলেন। এ সময় বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি তহমিদুর রহমানের নির্দেশে আশিকুর রহমান অন্যান্যদের সাথে নিয়ে শিক্ষক সহিদুল হকের উপর দেশীয় অস্ত্র ও রড দিয়ে হামলা চালিয়ে তাকে মাথায় গুরুতরভাবে রক্তাক্ত জখম করে আহত করে ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। পরে শিক্ষক সহিদুল হকের সহকর্মীরা রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে সেখাকার চিকিৎসকগণ তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে পাঠান। ভিকটিমের মাথায় দুইটি ক্ষতস্থানে মোট ৬ টি সেলাই পড়ে। এ বিষয়ে ভিকটিম সহিদুল হকের ছেলে তানভীর মাহমুদ বাদী হয়ে তহমিদুর রহমান, আলিহিম ও আশিকুর রহমানসহ অজ্ঞাতনামা আরো ২/৩ জনকে আসামী করে দৌলতপুর থানায় মামলা দায়ের করেন। যার মামলা নং- ২২, তারিখ- ১৮/০৭/২০২৩ খ্রিঃ এবং ধারা- ১৪৩/৩২৩/৩২৫/৩০৭/৫০৬(২) দন্ডবিধি। এই মামলায় তহমিদুর রহমান ও আলিহিম জামিনে থাকলেও গ্রেফতার এড়াতে প্রায় ১ মাস পালিয়ে থাকা আশিকুর রহমান গত বুধবার (১৬ আগষ্ট) আদালতে আত্মসমর্পণ করলে বিজ্ঞ আদালত তাকে জামিন না দিয়ে কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দেন।
ঘটনার পরদিন ১৯ জুলাই, বুধবার বেলা সাড়ে ১১ টায় বিদ্যালয় চত্বরে এক মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করে শিক্ষার্থীরা। এ সময় শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মচারী এবং এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গসহ অভিভাবকরাও এতে অংশ নেয়। মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারী ছাতারপাড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রিয়াজুল ইসলাম বলেন, গতকাল মঙ্গলবার বিদ্যালয়ে অভিভাবক সমাবেশে সঞ্চালক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন সহকারী শিক্ষক সহিদুল হক। এ সময় তিনি বক্তব্য দেওয়ার জন্য বিদ্যালয়ের অভিভাবক সদস্য জয়নাল আবেদীনকে আহবান জানান। জয়নাল আবেদীন ঐ সময় সেখানে উপস্থিত না থাকায় এবং পরক্ষণেই উপস্থিত হলে বক্তব্য দেয়া না দেয়া বিষয়ে সেখানে পরিবেশ কিছুটা উত্তপ্ত হয় এবং কমিটির লোকজন সঞ্চালকের উপরে ক্ষুদ্ধ হয়। পরে বিদ্যালয়ের অভিভাবক সদস্য জয়নাল আবেদীন, আজিজুল হক ও আলিহিম সভাপতি তহমিদুর রহমানকে নিয়ে অফিস কক্ষে শিক্ষক সহিদুল ইসলামের উপরে চড়াও হয়। এক পর্যায়ে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারী মাসে বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী (নিরাপত্তা কর্মী) হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত আলিহিমের ছেলে আশিকুর রহমান লোহার রড দিয়ে শিক্ষক সহিদুল হককে মারাত্বকভাবে রক্তাক্ত করে আহত করে। এ ঘটনার তীব্র প্রতিবাদের পাশাপাশি তারা দোষীদের শাস্তির দাবী জানায়। সেই সাথে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি তহমিদুর রহমানের অপসারণের দাবী জানায়। মানববন্ধনে অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক নূরে আলম ফরহাদ, অফিস সহকারী শিবলী আল ফারুকী, আরমান আলী, শিক্ষার্থী সাজ্জাদ মাহমুদ লিমন, জেনিফা তাসনিম, সোহানুর রহমান ও মায়া খাতুন।
এ বিষয়ে এই প্রতিবেদকের সাথে মুঠোফোনে কথা হলে প্রধান শিক্ষক রিয়াজুল ইসলাম জানান, ইতোমধ্যে নিজস্ব ব্যস্ততার কারণে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি তহমিদুর রহমান সময় দিতে না পারায় আগামী বৃহস্পতিবার (২৪ আগষ্ট) জরুরী সভা ডাকা হয়েছে। সেই সভায় তিনি বিদ্যালয়ের নিরাপত্তা কর্মী আশিকুর রহমানকে সাময়ীক বরখাস্তের প্রস্তাবপত্র উপস্থাপন করবেন, যা পরবর্তীতে তিনি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট কার্যকর করার লক্ষ্যে তা প্রেরণ করবেন।
“সম্প্রতি বিদ্যালয়ে চারটি শূন্যপদে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নিয়োগদানকে কেন্দ্র করে ম্যানেজিং কমিটি শিক্ষক সহিদুল হকের উপর ক্ষুব্ধ ছিলেন” এই রকম একটি কথা শোনা যাচ্ছে, এই বিষয়ে আপনার বক্তব্য কি? জানতে চাইলে রিয়াজুল ইসলাম বলেন, “এই বিষয়টি একেবারেই ভিত্তিহীন। নিয়োগ প্রক্রিয়া হয়েছে ফেব্রুয়ারী মাসে। নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে কোনো কথা নাই। আপনি প্রয়োজনে কেসের এজাহারটা দেখতে পারেন, এজাহারে কি উল্লেখ আছে। যদি এটাই হতো, তাহলে কেসের এজাহারে অবশ্যই উল্লেখ থাকতো যে, নিয়োগ বানিজ্য হয়েছে, এই বিষয়ে প্রতিবাদ করায় এই ঘটনা হয়েছে। বিষয়টা আসলে তা না।”
কথা হয় এই ঘটনায় মামলার বাদী ভিকটিমের ছেলে তানভীর মাহমুদের সাথে। তিনি বলেন, “মামলা-মোকদ্দমায় আমরা অতটা অভিজ্ঞ নয়। তাই অল্প সময়ে তারাহুড়ো করে এজাহারে সব কথা গুছিয়ে লেখা হয় নাই। তবে বাবার প্রতি তাদের ক্ষোভ দীর্ঘদিনের।” সর্বজন সমাদৃত বিদ্যালয়ের একজন প্রবীন শিক্ষক সহিদুল হকের উপর মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের পাহাড় সমান ক্ষোভ জমেছিল কি কারণে, তা আমজনতা জানতে চায়।