জাতিসংঘের প্রতিবেদনে গাজায় ইসরাইলি ‘গণহত্যায়’ সহযোগী কোম্পানিগুলোর তালিকা

Date: 2025-07-02
news-banner

অধিকৃত ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে নতুন একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক ফ্রান্সেসকা আলবানিজ। এতে বিশ্বের যেসব বহুজাতিক কোম্পানি ফিলিস্তিনে ইসরাইলের দখলদারি এবং গাজায় গণহত্যার যুদ্ধে সহযোগিতা করছে, তাদের একটা তালিকা করা হয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক বড় বড় কোম্পানির পাশাপাশি চীন ও মেক্সিকোর কোম্পানির নামও এসেছে।


ফ্রান্সেসকা আলবানিজ তার প্রতিবেদনে বলেছেন, এসব কোম্পানি আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন করে ফিলিস্তিনিদের তাদের ভিটেমাটি থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ ও অধিকৃত গাজা উপত্যকায় গণহত্যার যুদ্ধে ইসরাইলকে সহায়তা অব্যাহত রেখেছে।

 
ফ্রান্সেসকা আলবানিজের এই প্রতিবেদন আগামী বৃহস্পতিবার (৪ জুলাই) জেনেভায় সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করা হবে। এতে মোট ৪৮টি বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করা হয়েছে। 
 
এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতের জায়ান্ট মাইক্রোসফট, গুগলের মূল প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেট ইনকরপোরেটেড এবং অ্যামাজনের নাম। পাশাপাশি হাজারের বেশি করপোরেট প্রতিষ্ঠানের একটি ডাটাবেসও তৈরি করা হয়েছে।
 
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘ইসরাইলের এই চিরস্থায়ী দখলদারিত্ব অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ও বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জন্য আদর্শ এক পরীক্ষার মাঠে (টেস্টিং গ্রাউন্ড) পরিণত হয়েছে- যেখানে সরবরাহ ও চাহিদা উভয়ই ব্যাপক, নজরদারির সুযোগ নেই বললেই চলে এবং জবাবদিহির কোনো বালাই নেই। বিনিয়োগকারী ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো অবাধে মুনাফা অর্জন করছে।’
 
 
এতে গাজায় ইসরাইলের চলমান আক্রমণের প্রসঙ্গ টেনে বলা হয়, ‘এসব প্রতিষ্ঠান এখন আর শুধু দখলদারিত্বেই জড়িয়ে নেই, বরং তারা সম্ভবত গণহত্যার অর্থনীতির অংশ হয়ে উঠেছে।’ গত বছরও আলবানিজ তার এক লেখায় প্রায় একই কথা বলেছিলেন। সেটা হলো, গাজায় ইসরাইল গণহত্যা চালাচ্ছে বলে বিশ্বাস করার মতো ‘যৌক্তিক কারণ’ রয়েছে।
 
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এসব তথ্য-উপাত্ত থেকে এটা স্পষ্ট যে, ‘কেন ইসরাইলের গণহত্যা চলছেই। কারণ এটা অনেকের জন্য খুবই লাভজনক।’
 

প্রতিবেদনে যেসব অস্ত্র ও প্রযুক্তি কোম্পানিকে চিহ্নিত করা হয়েছে

 

ইসরাইলের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান সংগ্রহ বিশ্বের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ক্রয় কর্মসূচির অংশ। এটা বিশ্বের আটটি দেশের অন্তত ১ হাজার ৬০০ কোম্পানির উপর নির্ভরশীল। এই প্রকল্পের নেতৃত্বে আছে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র নির্মাতা কোম্পানি লকহিড মার্টিন। তবে এর বিভিন্ন যন্ত্রাংশ তৈরি হয় সারাবিশ্বে।
 
ইতালির অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান লিওনার্দো এসপিএকে ইসরাইলের সামরিক খাতের প্রধান সহযোগী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। জাপানের এফএএনইউসি করপোরেশন অস্ত্র তৈরির লাইনে ব্যবহৃত রোবট যন্ত্রপাতি সরবরাহ করছে।
 
প্রযুক্তি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো ফিলিস্তিনিদের উপর নজরদারি ও তাদের চলাফেরায় নিয়ন্ত্রণ আরোপের জন্য প্রয়োজনীয় বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণে ইসরাইলি সরকারকে সহায়তা দিচ্ছে যা ‘ইসরাইলের বৈষম্যমূলক ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করছে।
 
প্রতিবেদন মতে, মাইক্রোসফট, অ্যালফাবেট ও অ্যামাজনের মতো প্রযুক্তি কোম্পনি ইসরাইলকে তাদের ক্লাউড এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিতে প্রায় পুরোপুরি প্রবেশাধিকার দিয়েছে, যা ইসরাইলের তথ্য প্রক্রিয়াকরণ ও নজরদারির ক্ষমতা বাড়িয়েছে।


যুক্তরাষ্ট্রের আইটি প্রতিষ্ঠান আইবিএম ইসরাইলি সামরিক ও গোয়েন্দা সদস্যদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি, দেশটির অভিবাসন ও সীমান্ত কর্তৃপক্ষের বায়োমেট্রিক ডেটাবেজ পরিচালনার দায়িত্বও পালন করছে। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের সফটওয়্যার প্ল্যাটফর্ম পালান্টির টেকনোলজিস ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর প্রতি তাদের সহযোগিতা আরও বাড়িয়েছে।
 
প্রতিষ্ঠানটি ‘স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের’ সক্ষমতা সম্পন্ন ভবিষ্যদ্বাণীমূলক নজরদারি প্রযুক্তি সরবরাহ করেছে, যার মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারে যুদ্ধক্ষেত্রে তথ্য বিশ্লেষণ করা হয় এবং ‘ল্যাভেন্ডার’, ‘গসপেল’, ‘হোয়্যার’স ড্যাডি’র মতো এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে লক্ষ্যবস্তু তালিকা তৈরি করা হয়।
 

প্রতিবেদনে আরও যেসব কোম্পানির নাম উল্লেখ করা হয়েছে 

 

প্রতিবেদনে এমন কিছু প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে যা বেসামরিক প্রযুক্তি তৈরি করলেও সেগুলো ‘ডুয়াল-ইউজ টুল’ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে অর্থাৎ একই সঙ্গে সেগুলো দখলদারিত্ব বজায় রাখতে ব্যবহৃত হচ্ছে। 
 
এর মধ্যে রয়েছে ক্যাটারপিলার, লিওনার্দোর মালিকানাধীন রাডা ইলেকট্রনিক ইন্ডাস্ট্রিজ, দক্ষিণ কোরিয়ার এইচডি হুন্দাই এবং সুইডেনের ভলভো গ্রুপ। এ প্রতিষ্ঠানগুলো পশ্চিম তীর ও অন্যান্য এলাকায় অবৈধ বসতি স্থাপন এবং ঘরবাড়ি ধ্বংসে ব্যবহৃত ভারী যন্ত্রপাতি সরবরাহ করে।
 
বাড়িভাড়া প্ল্যাটফর্ম বুকিং ডটকম এবং এয়ারবিএনবি ইসরাইলি দখলকৃত এলাকায় অবস্থিত সম্পত্তি ও হোটেল রুম ভাড়ার মাধ্যমে অবৈধ বসতি স্থাপনে পরোক্ষ সহযোগিতা করছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ড্রামন্ড কোম্পানি ও সুইজারল্যান্ডের গ্লেনকোর মূলত কলম্বিয়া থেকে কয়লা সরবরাহের মাধ্যমে ইসরাইলের বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ভূমিকা রাখে।
 

 
কৃষিখাতে চীনের ব্রাইট ডেইরি অ্যান্ড ফুড ইসরাইলের বৃহত্তম খাদ্য কোম্পানি টনুভার মালিক, যেটি ফিলিস্তিনিদের কাছ থেকে দখল করা ভূমিতে উৎপাদিত পণ্যে লাভবান হচ্ছে। মেক্সিকোর অরবিয়া অ্যাডভান্স করপোরেশনের ৮০ শতাংশ মালিকানাধীন নেটাফিম কোম্পানি পশ্চিম তীরের দখলকৃত অঞ্চলে পানি শোষণের জন্য প্রয়োজনীয় ‘ড্রিপ ইরিগেশন’ প্রযুক্তি সরবরাহ করছে।
 
প্রতিবেদন মতে, ট্রেজারি বন্ডও গাজায় চলমান যুদ্ধের অর্থ জোগাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিশ্বের বড় বড় ব্যাংক, যেমন ফ্রান্সের বিএনপি পারিবাস এবং যুক্তরাজ্যের বার্কলেস ইসরাইলের ঋণ সংকট সামাল দিতে অর্থায়ন করেছে।
 

এসব কোম্পানির প্রধান বিনিয়োগকারী কারা?

 

যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ব্ল্যাকরক ও ভ্যানগার্ড এসব কোম্পানির বিনিয়োগকারী হিসেবে শীর্ষে রয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম সম্পদ ব্যবস্থাপক ব্ল্যাকরক পালান্টিরের ৮.৬, মাইক্রোসফটের ৭.৮, অ্যামাজনের ৬.৬, অ্যালফাবেটের ৬.৬, আইবিএমের ৮.৬, লকহিড মার্টিনের ৭.২ এবং ক্যাটারপিলারের ৭.৫ শতাংশ শেয়ারের মালিক।
 
ভ্যানগার্ড বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম সম্পদ ব্যবস্থাপক ক্যাটারপিলারের ৯.৮ শতাংশ, শেভরনের ৮.৯, পালান্টিরের ৯.১, লকহিড মার্টিনের ৯.২ এবং ইসরাইলি অস্ত্র নির্মাতা এলবিট সিস্টেমসের ২ শতাংশ শেয়ারের মালিক।
 

ইসরাইলের সাথে লেনদেন থেকে কি কোম্পানিগুলো লাভবান হচ্ছে?

 

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘ঔপনিবেশিক ব্যবসায় উদ্যোগগুলো এবং তাদের সহায়তায় গণহত্যাগুলো ঐতিহাসিকভাবে করপোরেট খাতের মাধ্যমে চালিত হয়েছে।’ ফিলিস্তিনি ভূমিতে ইসরাইলের সম্প্রসারণ ‘ঔপনিবেশিক বর্ণবাদী পুঁজিবাদ’র অন্যতম উদাহরণ, যেখানে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো অবৈধ দখলদারিত্ব থেকে মুনাফা অর্জন করছে।
 
‘যেসব প্রতিষ্ঠান আগে ইসরাইলি দখলদারিত্বে সক্রিয় ছিল এবং ফিলিস্তিনি নিধনে সহায়তা করে লাভবান হয়েছিল, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরাইল গাজায় যুদ্ধ শুরু করার পর সেখান থেকে সরে আসার পরিবর্তে সরাসরি গণহত্যার অর্থনীতিতে যুক্ত হয়েছে’ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
 
বিদেশি অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এই যুদ্ধ লোভনীয় ব্যবসায় উদ্যোগ হয়ে উঠেছে। ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে ইসরাইলের সামরিক বাজেট ৬৫ শতাংশ বৃদ্ধি পায় যার পরিমাণ দাঁড়ায় ৪৬.৫ বিলিয়ন ডলার। শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত কয়েকটি কোম্পানি, বিশেষ করে অস্ত্র, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো খাতের কোম্পানির মুনাফা ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে অনেক বেড়েছে।
 
 
তেল আবিব স্টক এক্সচেঞ্জের মোট মূলধন নজিরবিহীনভাবে ১৭৯ শতাংশ বেড়েছে। যার বাজারমূল্যে যোগ হয়েছে ১৫৭.৯ বিলিয়ন ডলার। এছাড়া আন্তর্জাতিক বিমা প্রতিষ্ঠান এলিয়ানজ ও অ্যাক্সাসহ বহু প্রতিষ্ঠান ইসরাইলি দখলদারিত্ব সংশ্লিষ্ট শেয়ার ও বন্ডে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেছে। যদিও একে মূলত মূলধনী রিজার্ভ হিসেবে দেখানো হয়েছে, আসলে এসব বিনিয়োগ থেকে মোটা অঙ্কের লাভ হচ্ছে।
 
এয়ারবিএনবি ২০১৮ সালে অবৈধ বসতিগুলোর সম্পত্তি তালিকা থেকে বাদ দিলেও পরে আবার সেগুলো যুক্ত করেছে। বর্তমানে সেসব সম্পত্তি থেকে অর্জিত অর্থের কিছু অংশ মানবিক কাজে দান করার কথা বলছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিবেদনে একে ‘হিউম্যানিটারিয়ান-ওয়াশিং’ বলা হয়েছে।
 

বেসরকারি কোম্পানিগুলো কি আন্তর্জাতিক আইন মানতে বাধ্য? 

 

আলবানিজের প্রতিবেদন অনুসারে, হ্যাঁ। কর্পোরেট কোম্পানিগুরো সরাসরি পদক্ষেপের মাধ্যমে বা তাদের ব্যবসায়িক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে মানবাধিকার লঙ্ঘন এড়ানোর ব্যাপারে দায়বধ্য।
 
রাষ্ট্রগুলোর প্রাথমিক দায়িত্ব হলো কর্পোরেট কোম্পানিগুলো মানবাধিকারের বিষয়টি সম্মান করছে কি না তা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মানবাধিকার লঙ্ঘন প্রতিরোধ, তদন্ত ও শাস্তি প্রদান নিশ্চিত করা। তবে কর্পোরেশনগুলোকে অবশ্যই মানবাধিকারকে সম্মান করতে হবে, এমনকি যদি সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্র তা নাও করে।

Leave Your Comments