আব্দুল্লাহ
আল মামুন (প্রধান প্রতিবেদক):
“দাঁত থাকতে দাঁতের মূল্য
বুঝলো না।” কেউ যদি সময়মতো কোনো কিছুর প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব না বুঝে সেই কাজে অবহেলা
করে, এবং এর ফলে ক্ষতির শিকার হয়, তখন এই প্রবাদবাক্যটি মিলে যায়। এর মাধ্যমে মূলত
সময়ের মূল্য বা সময়ের সদ্ব্যবহারকেই বুঝানো হয়েছে। দাঁতের বেলায়ও তাই। নিয়মিত দাঁতের
যত্ন না নিলে কিংবা দন্তচিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী প্রতি ৬ মাসে একবার, অন্তত বছরে
একবার দন্তচিকিৎসকের কাছে দাঁত দেখিয়ে না নিলে দাঁতের ছোট-খাটো সমস্যা অনেক সময়ই জটিল
আকার ধারণ করতে পারে। বিভিন্ন রোগ ব্যাধি ও দাঁতের ব্যথায় আক্রন্ত হয়ে দীর্ঘ সময় ভোগান্তিতে
থাকতে হতে পারে। আর দাঁতের ব্যথা যে কতটা কষ্টের, তা কেবল ভুক্তভোগীরাই জানেন।
দাঁত নিয়ে অনেকেই সমস্যায়
পড়ে থকেন। শিশু থেকে বৃদ্ধ, যে কারো যেকোনো সময়ে দাঁতে বিভিন্ন ধরণের সমস্যা দেখা দিতে
পারে। দাঁতের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে দন্তচিকিৎসকের শরণপন্ন হলে দেখা যায়, এর চিকিৎসা
খরচ অনেক বেশী। চিকিৎসা খরচ ব্যয়বহুল হওয়ার কারণে স্বল্প আয়ের মানুষদের অনেকের দ্বারাই
দাঁতের সম্পূর্ণ চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পন্ন করা সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। এর ফলে অনেকেই বিষম
যন্ত্রণা নিয়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে তীব্র দুঃখ-কষ্টে দিনের পর দিন পার করে থাকেন।
দাঁতের সু-চিকিৎসা অত্যন্ত
ব্যয়বহুল হওয়ার পেছনে যথেষ্ট যৌক্তিক কারণও রয়েছে। আধুনিক ডেন্টাল চিকিৎসায় উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর
সরঞ্জাম ও উপকরণর ব্যবহার করা হয়ে থাকে, যা জার্মান, জাপান ও আমেরিকাসহ বিভিন্ন উন্নত
দেশ থেকে ভালো দাম দিয়ে কিনে আনতে হয়। যেমন ডিজিটাল এক্স-রে, লেজার চিকিৎসা, ইমপ্ল্যান্ট
ইত্যাদি ক্ষেত্রে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার খরচ বাড়িয়ে দেয়। ডেন্টাল সার্জনের অভিজ্ঞতা
এবং দক্ষতাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিছু ক্ষেত্রে দাঁতের চিকিৎসা জটিল হতে পারে,
যার জন্যে একাধিক সেশনের প্রয়োজন হতে পারে অথবা বিশেষ ধরণের চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।
এর ফলে সামগ্রিক খরচ বেড়ে যায়। এছাড়া দেশে এখনো ডেন্টাল চিকিৎসার জন্য বীমা সুবিধা
সেভাবে জনপ্রিয় না হওয়ায় রোগীকে পুরো খরচ নিজেই বহন করতে হয়। তবে আশার কথা হচ্ছে, দেশের
সরকারি ডেন্টাল কলেজ বা হাসপাতালের ডেন্টাল ইউনিট এবং কিছু বেসরকারি হাসপাতালেও তুলনামূলক
কম খরচে ভালো মানের চিকিৎসা পাওয়া যায়। তেমনি একটি সরকারি হাসপাতাল হচ্ছে পিজি (বিএমইউ)
হাসপাতাল।
রাজধানীর শাহবাগে অবস্থিত
পিজি হাসপাতালের বর্তমান নাম বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যলয় (বিএমইউ)। এটি ১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দের
ডিসেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব পোস্টগ্র্যাজুয়েট মেডিসিন এ্যান্ড রিসার্চ
(আইপিজিএমআর) হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরে ১৯৯৮ খ্রিষ্টাব্দে এটিকে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে
রূপান্তর করা হয়। এর আগে আইপিজিএমআর এর নাম পরিবর্তন করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল
বিশ্ববিদ্যলয় রাখা হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৩ এপ্রিল ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দে অন্তর্বর্তীকালীন
সরকার একটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টির নাম পরিবর্তন করে “বাংলাদেশ মেডিকেল
বিশ্ববিদ্যালয়” (বিএমইউ) নামকরণ করে। তবে এটি পিজি হাসপাতাল নামেই সর্বাধিক পরিচিত।
এখানে ১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ডেন্টাল ইউনিট বা ডেন্টাল বিভাগ চালু রয়েছে। এটি একটি
পূর্ণাঙ্গ ডেন্টাল ইউনিট, যেখানে দাঁত ও মুখের বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা করা হয়। এখানে
দাঁতের বিভিন্ন ধরণের সমস্যা যেমন- সাধারণ চিকিৎসা, অস্ত্রপচারের মাধ্যমে দাঁত অপসারণ,
দাঁত বাঁধানো, আঁকাবাঁকা দাঁতের চিকিৎসা, ডেন্টাল ইমপ্ল্যান্ট, দাঁত স্কেলিং এবং রুট
প্ল্যানিং, রুট ক্যানেল ট্রিটমেন্ট, ক্যাপ ফিক্সিং, ক্ষতিগ্রস্থ দাঁত পুনরুদ্ধার ও
কসমেটিক ডেন্টিস্ট্রি, অর্থোদন্টিক চিকিৎসা এবং ওরাল ও ম্যাক্সিলোফেসিয়াল সার্জারি
করা হয়ে থাকে। এছাড়া চোয়াল ও মুখের বিভিন্ন জটিল রোগের চিকিৎসাও করা হয়ে থাকে। চোয়ালের
হাড়ের অস্ত্রপচার, টিউমার অপসারণ, দাঁতে ব্রেসিস পড়ানো ও মাড়ির রোগের চিকিৎসাও করা
হয়ে থাকে এখানে।
দাঁতের চিকিৎসার জন্য এই
হাসপাতালে এটি একটি ডেডিকেটেড ডেন্টাল বিভাগ। এখানে অভিজ্ঞ ডেন্টাল সার্জন, মেডিকেল
স্টাফ ও টেকনিশিয়ানদের তত্ত্বাবধানে এই চিকিৎসাগুলো করা হয়ে থাকে। স্বল্প খরচে দাঁত
ও মুখের চিকিৎসার মাধ্যমে রোগীদের বিভিন্ন সেবা গ্রহনের চমৎকার সুযোগ রয়েছে এখানে।
শুধুমাত্র শুক্রবার ব্যতিত প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৮ টা থেকে দুপুর ১ টার মধ্যে ৩০ টাকার
বিনিময়ে টিকিট সংগ্রহের মাধ্যমে ডাক্তার দেখিয়ে রোগ সনাক্তের পর নির্ধারিত সরকারি ফি
ব্যাংকে জমা দিয়ে দাঁতের চিকিৎসা শুরু করা যায় এই হাসপাতালে। দাঁতে ব্যথা বা কোনো সমস্যা
না হলে বেশিরভাগ মানুষই চিকিৎসকের কাছে যান না। দাঁতের সৌন্দর্য খুবই জরুরী বিষয়। তার
চেয়েও বেশি প্রয়োজনীয় বিষয় হচ্ছে দাঁতের সঠিক পরিচর্যা করা। তাই আর নয় অবহেলা। এখনই
শুরু করা যাক “দাঁত থাকতে দাঁতের মূল্য দেয়া।”