সিদ্ধিরগঞ্জ ভূমি অফিস যেন ঘুষের স্বর্গরাজ্য: তহসিলদার হাবিবুরের নামে-বেনামে কোটি টাকার সম্পদ পর্ব ১

Date: 2025-09-18
news-banner

সবুর খান: 


দেশ থেকে দুর্নীতি উচ্ছেদের লক্ষ্যে সংঘটিত হওয়া জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচারী শাসনের পতন ঘটলেও প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঘাপটি মেরে থাকা দুর্নীতিবাজদের দৌরাত্ম্য কমেনি। হাজারো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অনেক সরকারি দপ্তরই পরিণত হয়েছে ঘুষ ও অনিয়মের আখড়ায়। 

এমনই এক জ্বলন্ত উদাহরণ নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়ন ভূমি অফিস, যা স্থানীয়দের কাছে এখন ‘ঘুষের স্বর্গরাজ্য’ হিসেবে পরিচিত। আর এই স্বর্গরাজ্যের প্রধান নিয়ন্ত্রক হিসেবে অভিযোগের আঙুল উঠেছে ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (তহসিলদার) মোঃ হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে।



একাধিক বিশ্বস্ত সূত্র ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, তহসিলদার হাবিবুর রহমানের টেবিলে টাকা ছাড়া কোনো ফাইল নড়ে না। নামজারি, জমাভাগ, খাজনা আদায় কিংবা জমির পর্চা—প্রতিটি সেবার জন্যই রয়েছে তার নির্ধারিত ‘ঘুষের রেট’। সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি করে এবং কাজ ঝুলিয়ে রেখে অনৈতিকভাবে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন তিনি। এই অবৈধ আয়ের টাকায় তিনি গড়ে তুলেছেন কোটি কোটি টাকার সম্পদ।

অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, সিদ্ধিরগঞ্জের ভূমিপল্লী আবাসিক এলাকার ৩ নম্বর রোডের ১৩ নম্বর বাড়িতে তহসিলদার হাবিবুর রহমানের তিনটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের অস্তিত্বের সত্যতা পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের মতে, এই তিনটি ফ্ল্যাটের বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় তিন থেকে চার কোটি টাকা। শুধু তাই নয়, সিদ্ধিরগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় তার নামে-বেনামে আরও একাধিক প্লট ও ফ্ল্যাট রয়েছে বলে জানা গেছে, যা তিনি অবৈধ সম্পদ লুকাতে ব্যবহার করছেন। একজন সাধারণ সরকারি কর্মচারী হয়ে কীভাবে তিনি এত বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সর্বমহলে।

ভূমি অফিসে সেবা নিতে আসা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ভুক্তভোগী জানান, "এখানে নামজারি করাতে গেলে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা সরাসরি চুক্তি করতে হয়। টাকা না দিলে মাসের পর মাস ঘুরতে হয়, কিন্তু কাজ হয় না।" তিনি আরও বলেন, "হাবিবুর রহমান ঘুষের টাকা নেওয়ার সময় প্রায়ই বলেন, এই টাকা নাকি বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের মাঝে ভাগ করে দিতে হয়।"

ভুক্তভোগীদের ভাষ্যমতে, প্রায় ৮০ শতাংশ সেবাগ্রহীতা এখানে চরম হয়রানির শিকার হন। সরকারি নীতিমালার তোয়াক্কা না করে অতিরিক্ত টাকা আদায় এখন এই অফিসের অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। চুক্তির টাকা ছাড়া কোনো কাজই সময়মতো সম্পন্ন হয় না।

অভিযুক্ত হাবিবুর বার্তা বিচিত্রাকে জানান, তার অফিসে কোনো ধরনের লেনদেন হয় না এবং অফিসটিকে দালালমুক্ত রাখতে তিনি নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। ২৫ বছরের সরকারি চাকরি জীবনে তিনি সততা ও দায়িত্ববোধের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

তিনি জানান, তার পরিবার ও পূর্বপুরুষ—দাদা, নানা ও শ্বশুর—সবাই সচ্ছল, সম্মানিত এবং সরকারি চাকরির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ছাত্রজীবনে তিনি ঢাকা কলেজ রোভার স্কাউটসের প্রধান ছিলেন এবং সাংবাদিকতা পেশায় সক্রিয় ছিলেন। সেই শিক্ষাই তাকে আজও জনসেবায় অনুপ্রাণিত করে।

তবে হাবিবুরের ভূমি  পল্লীতে ফ্ল্যাট থাকার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি সুনিপুণভাবে সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যান।


তহসিলদার হাবিবুর রহমানের লাগামহীন দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারে অতিষ্ঠ সিদ্ধিরগঞ্জবাসী। তারা মনে করেন, জুলাই আন্দোলনের মূল চেতনা ছিল একটি শোষণ ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু হাবিবুর রহমানের মতো কর্মকর্তারা সেই চেতনাকে ভূলুণ্ঠিত করছেন। এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার সম্পদের উৎস খতিয়ে দেখতে এবং তাকে আইনের আওতায় আনতে অবিলম্বে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন ভুক্তভোগী মহল। তাদের প্রত্যাশা, দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে এই দুর্নীতিবাজের মুখোশ উন্মোচন করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।

Leave Your Comments