ঘুষের বিনিময়ে প্রধান শিক্ষকের পদ পাওয়া মিজান দুর্নীতির দায়ে বরখাস্ত

Date: 2025-10-14
news-banner

 

নিজস্ব প্রতিনিধি:

 

ঘুষ, দুর্নীতি ও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে নিলতী সমতট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে। তিনি মোটা অংকের ঘুষ দিয়ে যোগ্য প্রার্থীদের টপকে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের পদটি বাগিয়ে নিয়েছেন বলে বিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা যায়। ২০১৬ সালে নিয়োগপ্রাপ্ত হওয়ার পর থেকে এই শিক্ষক তার অযোগ্যতার স্বাক্ষর রেখেছেন বিদ্যালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয়গুলোতে। স্বেচ্ছাচারিতা, দুর্নীতি ও প্রতারণামূলক এসব কর্মকান্ডের জন্য ইতোমধ্যে তার বিরুদ্ধে ১৮৬০ সালের পেনাল কোড অনুযায়ী ৪০৬ ও ৪২০ ধারায় মামলাও হয়েছে। এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করেছেন বিদ্যালয় কমিটি। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনাটি পিরোজপুর জেলাধীন কাউখালী উপজেলার ঐতিহ্যবাহি উত্তর নিলতী সমতট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের।

 

জানা যায়, ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দে অমল কুমার দাস বিদ্যালয়টির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক থাকাবস্থায় প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান মো. মিজানুর রহমান। ঐ সময় বিদ্যালয় কমিটির সভাপতি ছিলেন স্থানীয় একটি মহিলা কলেজের একজন শিক্ষক। তিনিই মিজানুর রহমানের প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ পাওয়া বিষয়ে কলকাঠি নাড়েন। এ সময় মোটা অংকের আর্থিক লেনদেনেরও অভিযোগ রয়েছে। সূত্র মতে, প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ প্রাপ্তির পর মিজানুর রহমানের অনিয়ম ও দুর্নীতির চালিকা শক্তি হিসেবে ধীরে ধীরে গডফাদার হয়ে উঠেছেন নিয়োগদাতা তৎকালীন বিদ্যালয় কমিটির সভাপতি ও স্থানীয় মহিলা কলেজের ঐ শিক্ষক। মিজানকে দিয়ে বিভিন্ন অপকর্ম করিয়ে তিনি রয়ে যান ধরা ছোঁয়ার বাইরে।

 

মামলার বিবরণে জানা যায় যে, মিজানুর রহমান প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহনের পর হতে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাসিক বেতন, প্রশংসাপত্র, বিভিন্ন পরীক্ষার ফি আদায় ও এস.এ.সি পরীক্ষার্থীদের বোর্ড কর্তৃক নির্ধারিত ফি এর থেকে অতিরিক্ত ফি আদায় করে নিজের কাছে গচ্ছিত রেখে দীর্ঘদিন যাবত অনিয়ম ও দুর্নীতি করে আসছিলেন। বিভিন্ন খাত হতে সংগৃহিত অর্থ বিদ্যালয়ের নামে সোনালী ব্যাংকের হিসাব নং-১০০০০১৭৪৩ এ জমা করার কথা থাকলেও মিজানুর রহমান বিগত ০১/০৩/২০২৩ খ্রি. তারিখ হতে ৩১/১২/২০২৩ খি. তারিখ পর্যন্ত বিদ্যালয়ের আয়ের কোনো টাকা সেখানে জমা প্রদান করেন নাই। এছাড়াও এই বিদ্যালয়ের রয়েছে ৭০ শতক ফলজ ও বনজ সম্পত্তি। মিজানুর রহমান ওই সম্পত্তি হতে নারিকেল, সুপারী ও কাঠালসহ বিভিন্ন ধরনের ফলফলাদি এবং গাছপালা নিজের মতো করে বিক্রি করে দেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।

 

মিজানুর রহমানের অনিয়ম ও দুর্নীতির পরিসংখ্যান এখানেই শেষ নয়, গড ফাদারের ছত্রছায়ায় তার দুর্নীতির থাবা প্রসারিত হয়েছে বহুদুর পর্যন্ত। অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের প্রতি বিশেষ করে নারী শিক্ষকদের প্রতি তার রয়েছে ভিন্ন মনোভাব। সহকারী শিক্ষকদের দাপ্তরিক কোনো কাজের সমাধানের বিষয়ে তার শরণাপন্ন হলে “খুশি করা লাগবে“ বলে ভুক্তভোগীকে ইঙ্গিত দেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রধান শিক্ষক নিয়োগের জন্য সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা বজায় রাখার কথা থাকলেও মিজানুর রহমানের নিয়োগের ক্ষেত্রে তা হয়নি। অভিযোগ উঠেছে যে, নিয়োগ কমিটির কতিপয় সদস্য এবং তৎকালীন সভাপতি গডফাদাররূপী স্থানীয় মহিলা কলেজের ঐ শিক্ষকের যোগসাজশে এই দুর্নীতি সংঘটিত হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সদস্য জানিয়েছেন, মেধা তালিকায় মিজানুর রহমানের অবস্থান বেশ নিচে ছিল, কিন্তু মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পর থেকে অভিভাবক এবং শিক্ষার্থীরা ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। তাদের মতে, একজন অযোগ্য ব্যক্তি যদি প্রধান শিক্ষকের পদে থাকেন, তবে বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হবে। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা শঙ্কিত। একজন অভিভাবক বলেন, “আমরা চাই একজন যোগ্য শিক্ষক আমাদের সন্তানদের প্রধান শিক্ষক হোক, যিনি মেধা এবং সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবেন। ঘুষের মাধ্যমে আসা কোনো শিক্ষককে আমরা মানবো না।” এলাকাবাসী এবং সুশীল সমাজ এই ঘটনার দ্রুত এবং নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তারা চান, যারা এই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক। তাদের দাবি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এমন দুর্নীতি বরদাস্ত করা হবে না।

 

এ বিষয়ে মিজানুর রহমানের সাথে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি বলেন, “আমার বিরুদ্ধে আনীত সকল অভিযোগ মিথ্যা ও বনোয়াট।” প্রাসঙ্গিক বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি এই প্রতিবেদককে ব্যস্ততার অযুহাত দেখিয়ে রাত ৯ টা/ ১০ টার দিকে ফোন করতে বলে লাইনটি কেটে দেন। অতঃপর রাত সাড়ে ৯ টার দিকে তার মুঠোফোনে একাধিকবার কল দিলেও কোনো সাড়া দেননি মিজানুর রহমান। নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র থেকে জানা যায়, অনিয়ম ও দুর্নীতির দায়ে বরখাস্তকৃত প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমান তার অপকর্মগুলো চাপা দিতে এবং পূর্বের অবস্থান ফিরে পেতে উপর মহলে তদবিরে নেমেছেন।

 

মিজানুর রহমানের অপকরর্মের বিস্তারিত ফিরিস্তি এবং তার গডফাদাররূপী বিদ্যালয় কমিটির সাবেক সভাপতি স্থানীয় মহিলা কলেজের ঐ শিক্ষকের অনৈতিক কর্মকান্ড বিষয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন দেখতে চোখ রাখুন জাতীয় সাপ্তাহিক “বার্তা বিচিত্রা” পত্রিকার পরবর্তী সংখ্যায়। 

Leave Your Comments