যখন অপরাধী ধরা পড়ে, তখন মনে হয় সমাজে ন্যায়বিচারের চাকা ঘুরছে। সম্প্রতি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এক যুগলকে গ্রেফতার করেছে, যারা দীর্ঘ এক বছর ধরে বাংলাদেশেই পর্নোগ্রাফিক ভিডিও তৈরি করে বিদেশি ওয়েবসাইটে বিক্রি করছিল।
তারা শুধু নিজেরাই এই অন্ধকার জগতের বাসিন্দা ছিল না, বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও টেলিগ্রাম ব্যবহার করে নতুন মুখ নিয়োগের মাধ্যমে এই পাপের সাম্রাজ্য বিস্তারের চেষ্টাও করছিল। পুলিশের এই পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে প্রশংসার যোগ্য। তবে এই হাতকড়ার শব্দের চেয়েও জোরালোভাবে কানে বাজছে এক বছরের দীর্ঘ নীরবতার প্রতিধ্বনি। প্রশ্ন জাগে, এই একটি বছর আমাদের প্রশাসন কোথায় ছিল?
বিষয়টি শুধু একজন বা দুজন অপরাধীকে গ্রেফতারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর গভীরে লুকিয়ে আছে প্রশাসনিক উদাসীনতা, সামাজিক অবক্ষয় এবং আমাদের সম্মিলিত ব্যর্থতার এক করুণ চিত্র। যখন একটি অপরাধী চক্র দেশের ভেতরে বসেই শতাধিক পর্নোগ্রাফিক ভিডিও তৈরি ও প্রচারের সুযোগ পায়, তখন বুঝতে হবে আমাদের নজরদারির জাল কোথাও মারাত্মকভাবে ছেঁড়া।
আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আধুনিক প্রযুক্তি, সাইবার টহল ইউনিট এবং গোয়েন্দা নজরদারির সবরকম ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও কীভাবে একটি চক্র এক বছর ধরে সবার চোখের আড়ালে তাদের অশ্লীল বাণিজ্য চালিয়ে গেল? এটি নিছক অক্ষমতা নয়, বরং এটিকে এক ধরনের প্রশাসনিক অবহেলা বলাই শ্রেয়। দেরিতে হলেও এই গ্রেফতার একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ, কিন্তু এই বিলম্বের কারণে যে ক্ষতি ইতোমধ্যে হয়ে গেছে, তার দায় কে নেবে?
এই ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন কিছু নয়, এটি বরং ডিজিটাল মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক ভয়ঙ্কর মহামারির একটি উপসর্গ মাত্র। আজ যেকোনো বাংলাদেশি নাগরিকের জন্য, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের জন্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করা এক অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ফেসবুকে নিউজফিড স্ক্রল করতে গেলেই চোখে পড়ে অসংখ্য ১৮+ বিজ্ঞাপন। চটকদার ছবি, অশ্লীল ভিডিওর খণ্ডিত অংশ, বা বিভিন্ন গ্রুপ ও পেজের প্রলোভনমূলক আমন্ত্রণ—এ যেন এক ডিজিটাল নরকের দরজা। এই বিজ্ঞাপনগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা হয়, যা ব্যবহারকারীকে প্রলুব্ধ করে বিভিন্ন লিঙ্কে ক্লিক করতে বাধ্য করে। কেউ বিরক্ত হয়ে পাশ কাটিয়ে যায়, কেউ কৌতুহলের বশে ফাঁদে পা দেয়, আবার কেউবা নীরবে দেখে যায়।
প্রশ্ন হলো, এই বিজ্ঞাপনগুলো কারা নিয়ন্ত্রণ করছে? ফেসবুকের মতো একটি বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম, যার অ্যালগরিদম এতটা শক্তিশালী যে ব্যবহারকারীর মনের কথাও প্রায়শই আঁচ করে ফেলে, তারা কেন এই অশ্লীলতার প্রচার রুখতে পারছে না? বাংলাদেশে ২০১২ সালের পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী, পর্নোগ্রাফি তৈরি, বিপণন, সংরক্ষণ এবং প্রচার একটি গুরুতর দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু আইন যখন কাগজে সীমাবদ্ধ থাকে আর তার প্রয়োগ হয় বিলম্বিত, তখন অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। ফেসবুকের দেয়ালজুড়ে এই অশ্লীলতার ছড়াছড়ি প্রমাণ করে যে, আইন এবং তার প্রয়োগের মধ্যে এক বিশাল ফারাক রয়ে গেছে।
সামাজিক দায়বদ্ধতার সংকট
প্রশাসন বা ফেসবুক কর্তৃপক্ষকে দোষারোপ করা সহজ, কিন্তু আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের প্রশ্ন করার সময়ও এসেছে। সমাজ হিসেবে আমরা আসলে কী করছি? যখন আমাদের চোখের সামনেই কোনো বন্ধু বা পরিচিতজন একটি ১৮+ পেজের লিংক শেয়ার করে, কিংবা কোনো গ্রুপে অশ্লীল ভিডিওর বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়, তখন আমরা কজন তার সরাসরি প্রতিবাদ করি? আমাদের সিংহভাগই হয় “এড়িয়ে যাই” অথবা “চুপ থাকি”। আমাদের এই সম্মিলিত নীরবতাই অপরাধীদের সবচেয়ে বড় শক্তি। তারা জানে, সামাজিক প্রতিরোধ জোরালো নয়। এই ডিজিটাল নোংরামির বিরুদ্ধে আমাদের উদাসীনতা তাদের জন্য একপ্রকার অলিখিত লাইসেন্স।
আমরা আমাদের সন্তানদের হাতে স্মার্টফোন তুলে দিচ্ছি, কিন্তু তাদের ডিজিটাল ডিভাইস কতটা নিরাপদ, সেই খোঁজ রাখছি না। তরুণ প্রজন্মকে শেখানো হচ্ছে না যে, ভার্চুয়াল জগতের এক মুহূর্তের উত্তেজনা তাদের বাস্তব জীবনে দীর্ঘস্থায়ী লজ্জা, মানসিক অবসাদ এমনকি আইনি জটিলতার কারণ হতে পারে। এই অন্ধকার জগতে যারা কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে যোগ দিচ্ছে, তাদের অনেকেই হয়তো আর্থিক প্রলোভন বা অসচেতনতার শিকার। যদি শুরুতেই তাদের সঠিক পথ দেখানো যেত, তাহলে হয়তো তাদের জীবনটা এভাবে নষ্ট হতো না।
পুলিশের সাম্প্রতিক এই অভিযান প্রমাণ করেছে যে, রাষ্ট্র যদি চায়, তাহলে ডিজিটাল অপরাধ দমন করা সম্ভব। কিন্তু অপরাধ সংঘটিত হওয়ার এক বছর পর ব্যবস্থা নেওয়া কোনো স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। আমাদের প্রয়োজন একটি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা (Proactive Approach)। এমন একটি সার্বক্ষণিক সাইবার টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে, যারা নিয়মিতভাবে সামাজিক মাধ্যম পর্যবেক্ষণ করবে এবং অশ্লীল কনটেন্ট ছড়ানোর নেটওয়ার্কগুলো অঙ্কুরেই বিনষ্ট করবে। শুধু অপরাধী গ্রেফতার করলেই হবে না, এই নেটওয়ার্কের পেছনের মূল হোতাদের খুঁজে বের করতে হবে, যারা এই বাণিজ্য থেকে কোটি কোটি টাকা আয় করছে।
একইসাথে সামাজিক পর্যায়ে একটি বড় ধরনের আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন। বাবা-মা, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা এবং সামাজিক সংগঠনগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। সাইবার নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল নৈতিকতা নিয়ে স্কুল-কলেজে নিয়মিত কর্মশালার আয়োজন করতে হবে। তরুণদের বোঝাতে হবে, অনলাইনে তারা যা কিছু করে, তার একটি ডিজিটাল পদচিহ্ন (Digital Footprint) থেকে যায়, যা ভবিষ্যতে তাদের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো অশ্লীল বিজ্ঞাপন বা কনটেন্ট চোখে পড়লে তার বিরুদ্ধে রিপোর্ট করা এবং সম্ভব হলে এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া আমাদের নাগরিক দায়িত্ব।
আমি সিআইডিকে অভিনন্দন জানাই এই যুগলকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনার জন্য। এটি একটি অত্যন্ত জরুরি পদক্ষেপ ছিল। কিন্তু একইসাথে আমাদের স্মরণ করিয়ে দিতে হবে যে, আইন প্রয়োগ তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা সময়মতো এবং ধারাবাহিক হয়। দেরিতে পাওয়া ন্যায়বিচার আদতে অন্যায়কেই দীর্ঘায়িত করে। এক বছর ধরে যে বিষাক্ত কনটেন্ট সমাজে ছড়িয়েছে, তা ইতোমধ্যে আমাদের তরুণ প্রজন্মের একাংশের মননে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
মোহাম্মদ রনি, এল,এল,বি (অনার্স), এল,এল,এম।
প্রকাশক সাপ্তাহিক বার্তা বিচিত্রা।