নিজস্ব প্রতিনিধি:
পিরোজপুর জেলাধীন কাউখালী উপজেলার ঐতিহ্যবাহি উত্তর নিলতী সমতট
মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বরখাস্তকৃত প্রধান শিক্ষক মো. মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে ঘুষ,
দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগের ফিরিস্তি যেন বেড়েই চলেছে। মিজানের দুর্নীতির ছোঁয়া
লাগেনি, বিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট এমন কোনো খাত, যা “খুঁজে পাওয়া ভার।” সহকারী
শিক্ষকবৃন্দ ও বিদ্যালয়ের কর্মচারীরাও প্রতিনিয়ত পিষ্ট হন তার দুর্নীতির যাতাকলে। মিজানের
দুর্নীতির ছোবল থেকে বাদ যায়নি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীও। বিদ্যালয়টি যেন এক দুর্নীতির
রাজত্ব। যেখানে মিজান রাজা, বাকি সবাই প্রজা।
মিজানুর রহমানের দুর্নীতি বিষয়ে বার্তা বিচিত্রা পত্রিকায় গত
সংখ্যায় “ঘুষের বিনিময়ে প্রধান শিক্ষকের পদ পাওয়া মিজান দুর্নীতির দায়ে বরখাস্ত” শিরোনামে
একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়। সেখানে মিজানের দুর্নীতি ও অনিয়মের বেশকিছু চিত্র প্রকাশ
পায়। এতে মিজানুর রহমান কোনোরূপ প্রতিবাদলিপি না পঠিয়ে গত শুক্রবার (১৭ অক্টোবর)
বার্তা বিচিত্রার সম্পাদকের মুঠোফোনে কল দিয়ে তার বিরুদ্ধে নিইজ করে তার ক্ষতি না
করার জন্য অনুরোধ করেন। এক পর্যায়ে তিনি অজ্ঞাত এক ব্যক্তিকে ফোনে ধরিয়ে দিলে
অজ্ঞাত ব্যক্তি নিজেকে তিনটি পত্রিকার সম্পাদক পরিচয় দিয়ে মিজানের বিরুদ্ধে নিউজ
করার জন্য ক্ষিপ্ত স্বরে বার্তা বিচিত্রার সম্পাদককে হুমকি-ধামকি দেন। তবে তিনি
কোন তিনটি পত্রিকার সম্পাদক জানতে চাইলে অজ্ঞাত ব্যক্তি কোনো তথ্য দেননি। এমনকি
তার নামটিও বলেননি।
বার্তা বিচিত্রার পরবর্তী অনুসন্ধানে মিজানুর রহমানের দুর্নীতি
বিষয়ে জানা যায় যে, তিনি বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকবৃন্দ ও কর্মচারীদের টাইম স্কেল
পেতে প্রতিবন্ধকতা সৃস্টি করেন। এ প্রসঙ্গে সহকারী শিক্ষক-কর্মচারী এক হয়ে
বিদ্যালয় কমিটির সভাপতির নিকট লিখিত অভিযোগও করেন। অভিযোগপত্রে তারা বলেন, “প্রধান
শিক্ষক মিজানুর রহমান শিক্ষকদের টাইম স্কেল না দেওয়ার জন্য বিভিন্নভাবে তাল-বাহানা
করছে। এর ফলে আমরা শিক্ষকগণ আর্থিক ও মানসিক সমস্যার সম্মুখীনসহ হয়রানীর শিকার
হচ্ছি। প্রধান শিক্ষক আরো বলেন, কিছু পেতে হলে প্রতিষ্ঠানের বসকে খুশী করতে হবে।”
এই পত্রে মোট ৭ জন শিক্ষক-কর্মচারীর স্বাক্ষর রয়েছে।
প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর কাছ থেকেও উৎকোচ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে
মিজানের বিরুদ্ধে। জানা যায়, এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কাউখালী থানাধীন চিরাপাড়া
ইউনিয়নের বাসিন্দা ক্ষিতীশ মন্ডলের ছেলে হৃদয় মন্ডল। হৃদয় মন্ডল শারীরিক
প্রতিবন্ধী। নবম শ্রেণিতে রেজিষ্ট্রেশন হওয়ার পর বার্ষিক পরীক্ষায় অন্যান্যদের
সাথে লেখা-পড়ায় তাল মেলাতে না পারায় সে পার্শ্ববর্তী অন্য একটি বিদ্যালয়ে চলে যায়।
যেহেতু পূর্বের বিদ্যালয়ে তার রেজিষ্ট্রেশন করা রয়েছে তাই বর্তমান বিদ্যালয়ে
রেজিষ্ট্রেশন করতে ব্যর্থ হয়ে সে পুনরায় পূর্বের বিদ্যালয়ে ফিরে আসে। এ সময় বোর্ড
পরীক্ষায় অংশগ্রহনে বাধ সাধে প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমান। তবে কিছু টাকা হলে কোনো
বাধা নেই। বোর্ডে টাকা লাগবে অযুহাত দেখিয়ে তিনি শারীরিক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী
হৃদয় মন্ডলের কাছে টাকা দাবি করেন। বাড়ির পাশে ছোট্ট চায়ের দোকানী হৃদয়ের বাবা ক্ষিতীশ
মন্ডল অসহায়ের মতো প্রধান শিক্ষকের কছে অনুনয় বিনয় করেও কাজ হয়নি। প্রধান শিক্ষক
তার চায়ের দোকানে পর্যন্ত উপস্থিত হতেন। স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে চা বিক্রির আয়ে
সংসার চালানো ক্ষিতীশ মন্ডল বহু কষ্টে টাকা জোগার করে মিজানের হাতে দিলে হৃদয়
মন্ডল বোর্ড পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়। হৃদয় এই বিদ্যালয় থেকে এসএসসি. পাশ
করে কাউখালী সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি.তেও উত্তীর্ণ হয়ে বর্তমানে উচ্চতর শ্রেণিতে
ভর্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
বিদ্যালয় পরিচালনায় ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগে ম্যানেজিং কমিটির সভায়
সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত মোতাবেক স্মারক নং ইউএনএসইউবি/পারস/৪ তাং ১৯/০৫/২৪ খ্রি. মূলে
প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। অতঃপর তার বিরুদ্ধে
দুর্নীতির দায়ে বিজ্ঞ আদালতে মামলা হলে তিনি হীন স্বার্থে বল প্রয়োগ করে বিদ্যালয়ের
জরুরী কাগজপত্র সংরক্ষিত ঘরের তালা ভাঙ্গেন। এই বিষয়ে মিজানের বিরুদ্ধে আরো একটি
মামলা হয়। মিজানুর রহমানের এসব অনিয়মের পেছনের শক্তি হিসেবে তার নিয়োগদাতা তৎকালীন
কমিটির সভাপতি রয়েছেন বলে জানা যায়। মিজানুর রহমান তার অপকর্মগুলো চাপা দিতে এবং
পূর্বের অবস্থানে ফিরে যেতে উপর মহলে তদবির করছেন বলেও জানা গেছে। এ বিষয়ে পরবর্তী
অনুসন্ধানী প্রতিবেদন দেখতে চোখ রাখুন জাতীয় সাপ্তাহিক “বার্তা বিচিত্রা” পত্রিকার
আগামী সংখ্যায়।