সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অবক্ষয়ের প্রতিবিম্ব: হিরো আলম থেকে পর্নোগ্রাফি, আমাদের কুরুচির শেষ কোথায়?

Date: 2025-10-23
news-banner

আমরা এক অদ্ভুত সময়ে বাস করছি, যেখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পর্দাটি আমাদের সমাজের সম্মিলিত আয়না হয়ে উঠেছে। কিন্তু সেই আয়নায় আমরা যা দেখছি, তা কি আমাদের বাস্তবতার শৈল্পিক প্রতিফলন, নাকি আমাদের অন্তর্গত কদর্যতা ও রুচিহীনতার এক নগ্ন প্রতিচ্ছবি? হিরো আলম-রিয়া মনির ব্যক্তিগত জীবনের নাটকীয়তা থেকে শুরু করে সম্প্রতি পর্নোগ্রাফি তৈরির অভিযোগে এক দম্পতির গ্রেপ্তার—এই ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়, বরং একই অবক্ষয়ের ধারাবাহিকতার ভিন্ন ভিন্ন ধাপ। তারা কি সত্যিই বিনোদনের ফেরিওয়ালা, নাকি আমাদেরই সৃষ্টি করা এক বিকৃত চাহিদার যোগানদাতা? প্রশ্নটি আর কেবল বিনোদনের সংজ্ঞায় সীমাবদ্ধ নেই, এটি আমাদের সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক অবক্ষয়ের এক গভীর সংকটকে নির্দেশ করছে।

বিনোদন নয়, এ এক চূড়ান্ত অবক্ষয়ের ক্ষুধা

প্রথমেই স্বীকার করতে হবে, আমরা যা উপভোগ করছি, তার বড় একটি অংশের নাম বিনোদন নয়। এটি এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক পর্নোগ্রাফি, যেখানে অন্যের ব্যক্তিগত বিপর্যয়, ঝগড়া, এমনকি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডও আমাদের কাছে উপভোগ্য ‘কনটেন্ট’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। হিরো আলমের দাম্পত্য কলহ যখন ফেসবুক লাইভে হয়, তখন আমরা যেমন পপকর্ন হাতে উল্লাসে ফেটে পড়ি, ঠিক তেমনি সেই রুচিহীনতার পথ ধরেই আমরা পৌঁছে গেছি আরও ভয়াবহ এক গন্তব্যে। সম্প্রতি এক দম্পতি নিজেদের বেডরুমকে পর্নোগ্রাফির সেট বানিয়ে ‘প্রাপ্তবয়স্ক কনটেন্ট’ নামে যা বাজারজাত করছিল, তারও দর্শক কিন্তু এই আমরাই। তাদের গ্রেপ্তারের খবরে আমরা হয়তো নীতি পুলিশ সেজেছি, কিন্তু তাদের অবৈধ সাইটের সাবস্ক্রাইবার কারা ছিল? এই প্রক্রিয়াটি কেবল অমানবিক বা বেআইনিই নয়, এটি আমাদের সমষ্টিগত বিবেকের পচিয়ে ফেলার চূড়ান্ত আয়োজন। আমরা অন্যের লজ্জাকে, অন্যের অপরাধকে উপহাস বা ভোগের বস্তুতে পরিণত করছি। এর কারণ হলো, আমাদের ভেতরে এক গভীর শূন্যতা তৈরি হয়েছে, যা উন্নত শিল্প-সাহিত্য দিয়ে পূরণ না করে আমরা তাৎক্ষণিক, সস্তা ও কদর্য উত্তেজনায় পূরণ করতে চাইছি।

অনেকে এই প্রবণতাকে ‘রুচির দুর্ভিক্ষ’ বলেন, কিন্তু এখন এটি আর কেবল রুচির সংকটে সীমাবদ্ধ নেই; এটি নৈতিকতার মহামারিতে রূপ নিয়েছে। দুর্ভিক্ষ তখনই হয়, যখন সরবরাহ থাকে না। ভালো কনটেন্টের অভাব কি সত্যিই আছে? অবশ্যই না। কিন্তু আমরা সচেতনভাবে সেইসব এড়িয়ে গিয়ে সচেতনভাবে কদর্য, অশ্লীল এবং বিতর্কিত কনটেন্টের পেছনে ছুটছি। সুতরাং, এটি রুচির ‘স্বেচ্ছামৃত্যু’ থেকে ধাবিত হয়ে ‘নৈতিকতার গণআত্মহত্যা’র শামিল। আমরা এমন এক ভোক্তা শ্রেণীতে পরিণত হয়েছি, যারা স্বাস্থ্যকর খাবারের বদলে সচেতনভাবে বিষাক্ত মাদক বেছে নিই। হিরো আলমরা সেই বাজারের খুচরা বিক্রেতা হলে, পর্নোগ্রাফি নির্মাতারা হলো সেই বাজারের পাইকারি ডিলার। তারা ঠিকই বুঝতে পেরেছে যে, দর্শকরা কী চায়। তারা জেনে গেছে, একটি সুনির্মিত নাটকের চেয়ে একটি নোংরা গালাগালির লাইভ ভিডিওর দর্শক বেশি। আর সেই দর্শকদেরই একটি অংশ আরও এক ধাপ এগিয়ে গোপন ক্যামেরার ফুটেজ বা পর্নোগ্রাফিক কনটেন্টের জন্য অর্থ খরচ করতেও প্রস্তুত। সুতরাং, শুধু নির্মাতাদের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে দেওয়াটা এক ধরনের আত্মপ্রতারণা। আমরাই তো সেই দর্শক, যারা এই কদর্যতার চাহিদা তৈরি করে বাজারকে সচল রাখছি।

অবক্ষয়ের আগুনে ঘি ঢালা

এই অবক্ষয়ের আগুনে ঘি ঢালছে আমাদের গণমাধ্যমের একটি বড় অংশ। ‘ক্লিকবেইট’ সংস্কৃতির নেশায় তারা হিরো আলম-রিয়া মনির ব্যক্তিগত জীবনকে যেমন জাতীয় সংবাদ বানিয়েছে, তেমনি পর্নোগ্রাফি মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া দম্পতির মুখরোচক কাহিনিকেও তারা চটকদার শিরোনামে পরিবেশন করছে। তাদের বেডরুমের বর্ণনা, তাদের আয়ের পরিমাণ—এইসব খুঁটিনাটি খবর প্রকাশ করে তারা প্রকারান্তরে এই কুরুচিকেই বৈধতা দিচ্ছে। মূল সমস্যা—অর্থাৎ, কেন এই ধরনের কনটেন্টের চাহিদা তৈরি হচ্ছে, সেই গভীর সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে না গিয়ে তারা কেবল ঘটনার উপরিভাগের উত্তেজনাটুকুই বিক্রি করছে। তারা সংবাদের পবিত্রতাকে বিসর্জন দিয়ে একটি সস্তা সার্কাসের সঞ্চালকের ভূমিকা পালন করছে।


এই ধারার সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব। হিরো আলমের ঘটনা তরুণদের শেখাচ্ছিল যে, বিতর্ক তৈরি করেই তারকা হওয়া যায়। আর পর্নোগ্রাফি নির্মাতাদের ঘটনা সেই শিক্ষাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছে। নতুন প্রজন্ম এখন দেখছে, কেবল বিতর্ক নয়, রীতিমতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমেও অর্থ ও পরিচিতি পাওয়া সম্ভব। যখন ‘ভাইরাল হওয়া’ জীবনের মূলমন্ত্র হয়ে দাঁড়ায়, তখন কোনটা বিনোদন আর কোনটা অপরাধ—সেই সীমারেখা ঝাপসা হয়ে যায়। এর ফলে তরুণদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা, বিকৃত মানসিকতা এবং সামাজিক অবক্ষয় বাড়বে—এটাই স্বাভাবিক। আমরা তাদের সামনে এমন এক বিষাক্ত উদাহরণ তৈরি করছি, যা তাদের মেধা, মনন ও নৈতিকতাকে চিরতরে পঙ্গু করে দেবে।

হিরো আলম বা ঐ দম্পতি—এরা কেউ বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। তারা আমাদের সমাজের ক্ষত থেকে জন্ম নেওয়া একেকটি উপসর্গ মাত্র। তাদের উত্থান প্রমাণ করে, আমাদের সমাজ ভেতরে ভেতরে কতটা অসুস্থ। আমরা বিনোদন খুঁজছি না; আমরা আসলে নিজেদের ভেতরের শূন্যতা, হতাশা আর বিকৃত কুরুচিকে অন্যের মাধ্যমে প্রতিফলিত হতে দেখছি এবং তা উপভোগ করছি। এটা এক ধরনের বিকৃত আত্মরতি, যেখানে নিজের কদর্য চেহারা দেখেও আমরা পুলকিত হই। হিরো আলমের কুরুচিপূর্ণ গান থেকে শুরু করে এই দম্পতির পর্নোগ্রাফি পর্যন্ত যে যাত্রা, তা আমাদের নৈতিক পতনের একটি স্পষ্ট চিত্র। এই চক্র ভাঙার দায়িত্ব আমাদের সকলের। দর্শকের উচিত ‘বয়কট’ নামক সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্রটি ব্যবহার করা। যখন আমরা এসব কনটেন্ট দেখা, শেয়ার করা এবং তাতে অর্থলগ্নি করা বন্ধ করব, তখনই এই বিষাক্ত বাজার স্বাভাবিকভাবেই ধ্বংস হয়ে যাবে।
দিনশেষে, প্রশ্নটি আমাদের নিজেদের কাছেই করতে হবে। আমরা কি এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে মানুষের ব্যক্তিগত বিপর্যয়, এমনকি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডও বিনোদনের খোরাক হবে? নাকি আমরা এমন একটি সংস্কৃতি তৈরি করতে চাই, যা আমাদের উন্নত করবে, আলোকিত করবে?
এই ডিজিটাল আয়নাটি আমরাই তৈরি করেছি, এবং এর কদর্য প্রতিবিম্ব দেখে আঁতকে ওঠার দায়ও আমাদের। এখন আয়নাটি ভেঙে ফেলার সময় নয়, বরং নিজেদের চেহারাটা বদলে ফেলার সময় এসেছে। নতুবা এই অশ্লীলতার অন্ধকারেই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হারিয়ে যাবে।

মোহাম্মদ রনি 
এল,এল,বি (অনার্স), এল,এল,এম
ই-মেইল: [email protected]

Leave Your Comments