নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীর মুগদায় নির্মিত একটি ভবনের (তারেক টাওয়ার, ৪৫/১/এ, মুগদা) বেইজমেন্টে পার্কিংয়ের জায়গা দখল করে চলছে ‘মুগদা ডায়াগনস্টিক এন্ড ইমেজিং সেন্টার’-এর কার্যক্রম। আইন, নীতিমালা ও অনুমোদনপত্রের শর্ত ভেঙে এভাবে ব্যবসা পরিচালনা করা শুধু অবৈধ নয়, জননিরাপত্তার জন্যও মারাত্মক হুমকির।
বেইজমেন্টে ডায়াগনস্টিক সেন্টার পরিচালনা ইমারত নির্মাণ আইন, ১৯৫২; ঢাকা মহানগর ইমারত (নির্মাণ, উন্নয়ন, সংরক্ষণ ও অপসারণ) বিধিমালা, ২০০৮; এবং রাজউকের নির্মাণ অনুমোদনের শর্তাবলীর পরিপন্থী। এই অবৈধ কার্যক্রমের বিষয়ে রাজউক থেকে গত ২৬ জুন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের নিকট লিখিতভাবে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধের অনুরোধ জানানো হয়। এর আগে, ২৮ এপ্রিল রাজউক চেয়ারম্যান বরাবরও অভিযোগ দাখিল করা হয় (অভিযোগ প্রাপ্তি নং–৬৪৭)। কিন্তু ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো পর্যন্ত ভবন মালিক বা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ কেউই কোনো সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেয়নি। বরং তারা প্রকাশ্যে আইনের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করে অবৈধভাবে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, পার্কিংয়ের জায়গা দখল করে ডায়াগনস্টিক সেন্টার চালানোর কারণে এলাকাজুড়ে তীব্র যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। পাশাপাশি ভবনে গাড়ি রাখার জায়গা না থাকায় আশপাশের সড়কে গাড়ি থামানো হচ্ছে নির্বিচারে। এতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে। আরও ভয়াবহ বিষয় হলো—বেইজমেন্টে এমন স্থাপনা অগ্নিকাণ্ড বা দুর্ঘটনার সময় প্রাণহানির ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। অল্প সময়ের মধ্যে বের হওয়ার পথ না থাকায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে এই অবৈধ স্থাপনা।
এলাকাবাসীর একাধিক ব্যক্তি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “রাজধানীর মাঝখানে আইন ভেঙে এভাবে ব্যবসা চালানো মানে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার সঙ্গে তামাশা করা। রাজউক ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর চাইলে একদিনেই এই অবৈধ প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা সম্ভব।”
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ‘মুগদা ডায়াগনস্টিক এন্ড ইমেজিং সেন্টার’ নামের প্রতিষ্ঠানটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিবন্ধনপ্রাপ্ত। এতে প্রশ্ন উঠেছে—যেখানে ভবনের নকশা অনুযায়ী বেইজমেন্ট পার্কিংয়ের জন্য নির্ধারিত, সেখানে কীভাবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে নিবন্ধন পেল একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার? একইসঙ্গে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়া প্রতিষ্ঠানটি কিভাবে লাইসেন্স পেল, সেটিও এখন তদন্তসাপেক্ষ। সচেতন মহলের মতে, এসব ঘটনার মাধ্যমে প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাব ও তদারকির দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ভবন মালিক তারিকুল ইসলাম অবশ্য স্বীকার করেছেন, “পার্কিংয়ের পরিবর্তে ডায়াগনস্টিক সেন্টার ভাড়া দেওয়া ভুল হয়েছে। আমরা রাজউকের নোটিশ পেয়েছি, শীঘ্রই প্রতিষ্ঠানটি দোতলায় স্থানান্তর করা হবে।” একইভাবে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের শেয়ারহোল্ডার পলাশ মাহমুদও একই কথা বলেন। তবে রাজউক কর্তৃপক্ষ বলছে, এসব প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন এখনো তারা দেখেনি।
রাজউকের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, সরেজমিনে পরিদর্শনে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। এরপর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে অবৈধ কার্যক্রম বন্ধের অনুরোধ জানানো হয়েছে। তবুও প্রতিষ্ঠানটি কার্যক্রম চালিয়ে গেলে বিধিমালা অনুযায়ী পরবর্তী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বেইজমেন্টে ডায়াগনস্টিক সেন্টার পরিচালনা মানে মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা। এমন স্থাপনায় রেডিয়েশন, গ্যাস ও বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি থেকে আগুন লাগার ঝুঁকি অনেক বেশি। এছাড়া রোগীদের নিয়মিত যাতায়াতের কারণে বেইজমেন্টে বাতাস চলাচল কমে যায়, যা যেকোনো সময় প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
সচেতন মহল বলছে, এখনই সময় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার। রাজউকের উচিত অনুমোদন ভঙ্গের দায়ে ভবন মালিকের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উচিত নিবন্ধন বাতিল করে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ ঘোষণা করা এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের উচিত তাদের ছাড়পত্র ও নিরাপত্তা যাচাই করা। অন্যথায় রাজধানীর অন্যান্য এলাকাতেও একইভাবে আইন উপেক্ষা করে বেসমেন্ট দখল করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার দৃষ্টান্ত ছড়িয়ে পড়বে।
রাজধানীবাসী বলছেন, আইন থাকলেও এর প্রয়োগ নেই বলেই এই ঔদ্ধত্যে ভর করে চলেছে এমন অসংখ্য অবৈধ প্রতিষ্ঠান। এখন প্রয়োজন কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ, যাতে আইনের প্রতি অসম্মানকারীদের জবাব বাস্তব কর্মের মাধ্যমেই দেওয়া যায়।