বাঘিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ

Date: 2025-11-01
news-banner


তাছলিমা তমাঃ 

গাজীপুর মহানগরের কোনাবাড়ি থানাধীন ১১নং ওয়ার্ডের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান “বাঘিয়া উচ্চ বিদ্যালয়”-এর বর্তমান প্রধান শিক্ষক মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম লিটন-এর বিরুদ্ধে একাধিক অনিয়ম, আর্থিক দুর্নীতি, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ উঠেছে।

বিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক ও অভিভাবক সূত্রে জানা যায়, বিদ্যালয়ের মার্কেট থেকে প্রাপ্ত ভাড়ার টাকা দীর্ঘদিন ধরে গোপন রাখা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, উক্ত মার্কেটের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ প্রধান শিক্ষক নিজেই আত্মসাৎ করেছেন এবং পরবর্তীতে কিছু শিক্ষকের মাঝে সামান্য অংশ বণ্টন করে তাদের নিজের অনুগত করে রেখেছেন।
ওই শিক্ষকরাই বর্তমানে প্রধান শিক্ষকের হয়ে ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচনে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন বলে জানা গেছে।

অ্যাডহক কমিটি ও অনিয়মের বিস্তার

বিদ্যালয়টি বর্তমানে অ্যাডহক কমিটি দ্বারা পরিচালিত থাকলেও অভিযোগ রয়েছে যে, এই কমিটি আসলে প্রধান শিক্ষক লিটনের প্রভাবেই পরিচালিত হচ্ছে।
প্রতিটি ক্লাসরুমে তিনি নিজে উপস্থিত থেকে শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন। এমনকি হ্যান্ডবিল বিতরণ করে নির্দিষ্ট প্রতীকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

 রাজনৈতিক প্রভাব ও অতীতের দুর্নীতির ছায়াঃ

অভিযোগ রয়েছে, প্রধান শিক্ষক সাইফুল ইসলাম লিটন বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছিলেন।
তিনি সেই সরকারের মন্ত্রী ও এমপিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সুযোগে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে প্রভাব বিস্তার করেছেন।
এমনকি গাজীপুরের সাবেক মন্ত্রী ও এমপিদের সঙ্গে তার অসংখ্য ছবি সামাজিক মাধ্যমে ঘুরে বেড়াচ্ছে,
যা প্রমাণ করে যে তিনি বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের লোক হিসেবে তখন দুর্নীতি করে গেছেন এবং এখনো সেই প্রভাব কাজে লাগিয়ে বিদ্যালয়টি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন।

স্থানীয় অভিভাবকরা দাবি করেছেন, এই রাজনৈতিক প্রভাব ও অতীত সম্পর্কের কারণেই বিদ্যালয়ে দুর্নীতির জাল ছড়িয়েছে,
আর সুশাসন বা স্বচ্ছ প্রশাসনিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠা করা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়েছে।

 বিদ্যালয়ের সম্পত্তি ও অর্থ আত্মসাৎঃ

বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, কোনাবাড়ী বাঘিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সম্পত্তির একটি অংশ বিক্রি করে প্রায় ৮০ লক্ষ টাকা আয় হয়েছে।
এর মধ্যে ২০ লক্ষ টাকা কিছু লোককে ফেরত দেওয়া হলেও বাকি ৬০ লক্ষ টাকা প্রধান শিক্ষক আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই অর্থ ব্যবহার করে তিনি নিজ মনোনীত প্রার্থী দাঁড় করিয়ে বর্তমানে “আউয়াল গ্রুপ”-এর হয়ে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন।

এছাড়া স্থানীয় সূত্র জানায়, বিদ্যালয়ের মার্কেটের ভাড়া, দাতা অনুদান ও সরকারি বরাদ্দের টাকাসহ সকল আর্থিক কার্যক্রম তিনি একাই নিয়ন্ত্রণ করছেন।
কিন্তু কোনো হিসাব বা আর্থিক প্রতিবেদন কখনোই প্রকাশ করেননি।

 অতীত বিতর্ক ও মামলার প্রসঙ্গঃ

বিদ্যালয়ের সাবেক সদস্য ডেবরা জাহাঙ্গীর বাবুল-এর বিরুদ্ধে পূর্বে দায়ের হওয়া ধধর্ষণ মামলার ব্যাপারে জানা যায়,
যদিও মামলাটি গাজীপুর কোর্টে হয়, বাবুল মাস্টার সম্পূর্ণভাবে নির্দোষ প্রমাণিত হন।
পরবর্তীতে রেজুলেশনের মাধ্যমে সাবেক সভাপতি শামসুল হক সহ স্কুল কমিটি ওই মামলার নিষ্পত্তি করেন এবং বাবুলকে প্রাপ্য টাকা দেওয়ার অঙ্গীকার করেন।

রেজুলেশনে উল্লেখ আছে —

“বাঘিয়া স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি মিথ্যা ও ভিত্তিহীন মামলাটি নিজেদের খরচে তুলে নিবে।”

অভিভাবক ও শিক্ষকদের ক্ষোভঃ

একজন অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
“বিদ্যালয়ের টাকার কোনো স্বচ্ছ হিসাব নেই। এখন আবার সেই টাকা দিয়ে কিছু শিক্ষককে পাশে নিয়ে নির্বাচন প্রভাবিত করার চেষ্টা চলছে। এটা শিক্ষাঙ্গনের জন্য লজ্জাজনক।”

একজন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান,
 “প্রধান শিক্ষক দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়ের অর্থ ব্যবস্থাপনায় একক কর্তৃত্ব দেখিয়ে আসছেন। অনেকবার হিসাব চাওয়া হলেও তিনি কোনোদিন লিখিত প্রতিবেদন দেননি। এখন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শিক্ষকদের ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন।”

 ভুয়া প্রচারণা ও বিভ্রান্তিঃ

এদিকে অভিভাবক মহলে অভিযোগ উঠেছে,
সম্প্রতি কিছু অনলাইন মাধ্যমে প্রধান শিক্ষকের পক্ষে একতরফা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে,
যা প্রকৃতপক্ষে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর।
প্রকৃত অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়গুলো আড়াল করতে এসব প্রচার চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা।

বিদ্যালয়ে বাড়তি ফি আদায় ও কোচিং বাণিজ্যঃ

বিদ্যালয়ে কৃষকের ও খেটে খাওয়া মানুষের ছেলে-মেয়েরা লেখাপড়া করে।
অভিভাবক সূত্রে জানা গেছে, এখানে চলছে কোচিং বাণিজ্য, সেশন ফি, উন্নয়ন ফি, পরীক্ষার ফি, জেনারেটর ফি ও নানা অজুহাতে অতিরিক্ত অর্থ আদায়।
বছর শেষে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৩-৪ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয় রসিদ ছাড়া।
বর্তমানে বিদ্যালয়টি সরকারি হলেও প্রাইভেট স্কুলের চেয়েও বেশি অর্থ আদায় করা হচ্ছে,
যা সাধারণ অভিভাবকদের জন্য গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শিক্ষা বোর্ড ও জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে দ্রুত তদন্ত দাবি জানিয়েছেন অভিভাবকরা।

তদন্তের দাবিঃ

স্থানীয় সচেতন মহল ও শিক্ষানুরাগীরা জানিয়েছেন,
বিদ্যালয়ের সুষ্ঠু পরিবেশ রক্ষায় দ্রুত তদন্ত করে প্রকৃত সত্য উদঘাটনের জন্য জেলা শিক্ষা অফিসের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।

Leave Your Comments