প্রধান শিক্ষক মিজানের দুর্নীতি বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ ও তার প্রতিবাদলিপি

Date: 2025-11-02
news-banner

 

নিজস্ব প্রতিনিধি:

 

পিরোজপুরের কাউখালী উপজেলার উত্তর নিলতী সমতট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সাময়িক বরখাস্তকৃত প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমানের দুর্নীতি বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে বার্তা বিচিত্রা পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের পর তিনি পত্রিকা অফিসে প্রতিবাদলিপি পাঠিয়েছেন। প্রতিবাদলিপিতে তিনি “উক্ত প্রকাশিত সংবাদ সম্পূর্ণ ভূয়া, ভিত্তিহীন, মিথ্যা ও বানোয়াট“ বলে উল্লেখ করেছেন। সেখানে তিনি সম্পাদক বরাবর আরো বলেন, “উক্ত সংবাদের প্রতিবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রদানসহ যাবতীয় ব্যবস্থা আগামী ১৫ কার্য দিবসের মধ্যে গ্রহন করতে আপনার সদয় মর্জি হয়। অন্যথায় আইনের আশ্রয় নিতে বাধ্য হবো।”

 

প্রকৃতপক্ষে বার্তা বিচিত্রা পত্রিকায় মিজানুর রহমানের দুর্নীতি ও অনিয়ম বিষয়ে যে সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে, তার স্বপক্ষে একাধিক সূত্রের বক্তব্য ও দলিল দস্তাবেজ বার্তা বিচিত্রার হাতে রয়েছে। সেখানে দেখা যায় যে, বিদ্যালয় পরিচালনায় ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগে তৎকালীন কমিটি প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করেন। যার স্মারক নং- ইউএনএসইউবি/পারস/৪ তারিখ- ১৯/০৫/২৪ খ্রি.। নিজের সাময়িক বরখাস্তের পত্রটিও প্রতিবাদলিপির সঙ্গে প্রেরণ করেছেন মিজানুর রহমান।

 

প্রতিবাদলিপিতে মিজানুর রহমান অভিযোগ আকারে আরো বলেন, “২০১৬ সালে অত্র বিদ্যালয়ের শিক্ষক জাহানারা আক্তার প্রধান শিক্ষক পদপ্রার্থী ছিলেন। জাহানারা আক্তার ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক পদ থেকে প্রধান শিক্ষক পদে স্থায়ীভাবে বহাল থাকার জন্য আমার বিরুদ্ধে হয়রানী করার জন্য অন্য ব্যক্তিকে প্ররোচিত করে পিরোজপুর আদালতে ৫০/২৪ নং মিথ্যা মামলা দায়ের করেন।” এ বিষয়ে বার্তা বিচিত্রার অনুসন্ধানে জানা যায় যে, বিদ্যালয়ের তৎকালীন কমিটির সভাপতি মো. আকতারুজ্জামান কর্তৃক স্বাক্ষরিত “প্রধান শিক্ষক নিয়োগ/বাছাই পরীক্ষা-২০১৬ এর নম্বর ফর্দ (সিএস কপি)” এর ৪ নং ক্রমিকে প্রধান শিক্ষক পদপ্রার্থী মিজানুর রহমানসহ উক্ত নম্বর ফর্দে মোট ৫ জনের নাম রয়েছে। তবে সেখানে জাহানারা আক্তারের নাম নেই। ভাবনায় ছেদ পড়ার বিষয় হচ্ছে, মিজানুর রহমান তার প্রতিবাদলিপিতে উক্ত প্রধান শিক্ষক পদপ্রার্থী হিসেবে অত্র বিদ্যালয়ের শুধুমাত্র জাহানারা আক্তারের নাম উল্লেখ করলেও প্রকৃতপক্ষে এই পদে অত্র বিদ্যালয়ের আরো দুইজন প্রার্থী ছিলেন। একজন হলেন বাবুল কৃষ্ণ ঘোষ, অন্যজন অমল কুমার দাস। জানা যায়, ওনারা কেউই সেচ্ছায় এই পদে আগ্রহী ছিলেন না। তিন জনকেই বাসায় আলাদা আলাদা ডেকে নিয়ে এই পদের প্রলোভন দেখিয়ে আশ্বস্ত করা হয়। পরবর্তীতে মিজানের আগ্রহ জোরালো হলে ঐ তিন জনকে বাদ দেওয়া হয়। আবারো তাঁদের তিন জনকে আলাদা আলাদা ডেকে নিয়ে মিজানের নাম উল্লেখ করে তথাকথিত যৌক্তিকতার বাণী শুনিয়ে তাদেরকে আশাহীন করা হয়। তাঁদের মধ্য হতে একজনকে বলা হয়, “পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পেলেও তাকে এই পদে নেওয়া সম্ভব নয়।” এই বৈরী পরিস্থিতিতে বিষয়টির একটি “বিমূর্ত ধারণা” পেয়ে ঐ তিন জনের সবাই প্রধান শিক্ষক পদের আশা ছেড়ে দেন, এবং তাঁরা কেউই পরীক্ষায় অংশ গ্রহন করেননি বলে জানা যায়। কারণ তাঁরা ইতোমধ্যে জেনে গেছেন যে, কে হতে যাচ্ছে উত্তর নিলতী সমতট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। আর এই কাজটি সুকৌশলে পরিচালনা করেন বিদ্যালয় কমিটির সভাপতি মো. আকতারুজ্জামান। অথচ ঐ তিন শিক্ষককে আশ্বস্ত করার সময় তাদের কাছ থেকে ব্যাংক ড্রাফটের টাকা নিয়ে নিজ হাতে জমা দিয়েছিলেন আকতারুজ্জামান। এ বিষয়ে বিশ্বস্তসূত্রে একাধিক জোরালো বক্তব্য রয়েছে। সূত্র মতে, অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে প্রধান শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষাটিকে একটি প্রহসনমূলক নাটক সাজিয়েছিলেন কমিটির সভাপতি মো. আকতারুজ্জামান। এ বিষয়ে সাবেক সভাপতি আকতারুজ্জামানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এগুলো ভিত্তিহীন কথা। ঐ সময়ে এই বিদ্যালয়ের একজন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ছিলেন, তিনিও তার পদ ছেড়ে দিয়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহন করেছিলেন।“ প্রকৃতপক্ষে তিনি পরীক্ষায় অংশগ্রহন করেন নাই বলে জানা গেছে। আকতারুজ্জামান গ্রামের মানুষদের কথা উল্লেখ করে আরো বলেন, “আমার বিশ্বাস এগুলি যারা বলছে, তারা মিথ্যা বলছে।”

 

জাহানারা আক্তার ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব গ্রহনের পর থেকে প্রধান শিক্ষক পদে স্থায়ীভাবে বহাল থাকার জন্য মিজানের বিরুদ্ধে হয়রানীমূলক কার্যক্রম চালাচ্ছেন, মিজানুর রহমানের প্রতিবাদলিপিতে এই বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে জাহানারা আক্তার বলেন, “মিজানের এই বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। প্রধান শিক্ষক হতে হলে বিধি মোতাবেক সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে ৩ বছরের অভিজ্ঞতার প্রয়োজন রয়েছে। আমি কখনো সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে ছিলাম না। সিনিয়র সহকারী শিক্ষক হিসেবে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছি। অন্যদিকে আমার চাকুরীর সময়কাল রয়েছে মাত্র ২ বছর ২ মাস। অতএব আমি প্রধান শিক্ষক পদে স্থায়ীভাবে বহাল থাকার বিষয়ে মিজানের বক্তব্য উদ্দেশ্য প্রণোদিত।” তিনি আরো বলেন, “ইতোমধ্যে প্রসাশনের তদন্ত এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের তদন্তে মিজানুর রহমানের বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে। বিদ্যালয়ের স্বার্থে সকল শিক্ষক-কর্মচারী ও অভিভাবকদের সম্মিলিত মতামতের ভিত্তিতে আমরা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে মিজানুর রহমানের মতো দুর্নীতিবাজ শিক্ষকের অপসারণ ও বিচারের দাবি জানাই।”

 

প্রতিবাদলিপিতে মিজানুর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করার প্ররোচিত বাদী “অন্য ব্যক্তি” বলতে তিনি যাকে বুঝিয়েছেন, তার নাম রাজ্জাক তালুকদার। যিনি এই বিদ্যালয়ের অভিভাবক সদস্য। তার দুটি সন্তান এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বলে জানা যায়। তবে মামলাটির পুলিশি তদন্তে মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে অপরাধের সত্যতা পাওয়া গেছে। এই মামলায় বিজ্ঞ আদালত তদন্তের জন্য অফিসার ইনচার্জ জেলা গোয়েন্দা শাখা পিরোজপুরকে নির্দেশ প্রদান করেন। তদন্ত শেষে বিজ্ঞ আদালতে দাখিলকৃত প্রতিবেদনে তদন্ত অফিসারের মতামত এখানে হুবহু তুলে ধরা হলো। তদন্তকারী অফিসারের মতামত: “তদন্তকালীন প্রাপ্ত স্বাক্ষীদের জবানবন্দি, ব্যাংক স্টেটমেন্ট নিরীক্ষা, কমিটির রিপোর্ট ও ভূয়া ভাউচার পর্যালোচনায় বিবাদী মো. মিজানুর রহমান হাওলাদার, পিতা- মো. দবির উদ্দিন হাওলাদার, মাতা- সালেহা বেগম ওরফে ফাতিমা, সাং- কিসমত গড়ঘাটা ০৮ নং ওয়ার্ড, থানা- মোড়েলগঞ্জ, জেলা- বাগেরহাট, এ/পি সাং- উত্তর নিলতী সমতট মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক (সাময়িক বরখাস্ত) থানা- কাউখালী, জেলা- পিরোজপুর এর বিরুদ্ধে বাদী কর্তৃক আনীত অভিযোগে ৪০৬/৪২০ ধারা অপরাধ প্রাথমিকভাবে প্রমানিত হইয়াছে।”

 

মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে অপর একটি মামলার বিবরণে জানা যায় যে, তার নেতৃত্বে কতিপয় বহিরাগত লোকজন বেআইনি জনতাবদ্ধ হয়ে দেশীয় অস্ত্র-সস্ত্রে (যেমন: গাছকাটা দাও, চাইনিজ কুঠার, শাবল, হকিস্টিক, হাতুরি ও রামদাও) সজ্জিত হয়ে বিদ্যালয়ে অনধিকার প্রবেশ করে বাদীকে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে অফিস কক্ষের তালা ভেঙ্গে ভিতরে প্রবেশ করে কক্ষে থাকা টেবিলের ড্রয়ারে রক্ষিত মূল্যবান দলিল ও বাদীর ব্যাংকে জমা করার উদ্দেশ্যে রক্ষিত ৬৩ হাজার টাকা নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় এই মামলার সাক্ষী উপস্থিত অন্যান্য শিক্ষকবৃন্দ বাধা প্রদান করলে তাদেরকে খুন, জখম ও মৃত্যুভয় দেখিয়ে উক্ত টাকা ও মূল্যবান কাগজপত্র জোর পূর্বক ছিনিয়ে নিয়ে যায়। এ সময় মিজান গংরা বিদ্যালয়ে অগ্নি সংযোগের উদ্যোগ গ্রহন করলে বাদী ও অন্যান্য শিক্ষক-কর্মচারীদের ডাক-চিৎকারে এলাকার লোকজন এগিয়ে এসে বাধা প্রদান করলে তারা বিদ্যালয়ে আগুন দিতে ব্যর্থ হয়। ইতোমধ্যে স্থানীয় স্বাক্ষীদের মধ্য হতে মোবাইল ফোনে কাউখালী থানায় যোগাযোগ করা হলে থানা হতে পুলিশ চলে আসে। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে মিজান গংরা পালিয়ে যায়। যাওয়ার সময় তারা পরবর্তীতে সুযোগ-সুবিধা মতো অগ্নি সংযোগ করে বিদ্যালয়টি পোড়াইয়া দেওয়ার এবং বাদীসহ বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের খুন জখম করার হুমকি দিয়ে যায় বলে মামলা সূত্রে জানা যায়। এ বিষয়ে সি.আর. মামলা নম্বর ৭১, তারিখ: ২০/০৫/২০২৫ খ্রি.। ধারা: ১৪৩/৪৪৭/৪২৭/৩৮৫/৩৮৬/৩৮৭/৫০৬(২)/১০৯ দন্ডবিধি। মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে দুটি মামলাই চলমান রয়েছে বলে জানা যায়।

 

এদিকে মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার প্রায় দেড় মাস আগেই ক্রটিপূর্ণ উল্লেখ করে এক পত্র জারির মাধ্যমে বিদ্যালয় কমিটি ভেঙ্গে দিয়েছে শিক্ষা বোর্ড। যার স্মারক নং- বাশিবো/বিঅনু:/২০২৫/৩২৬৬ তারিখ: ৩০/০৯/২০২৫ খ্রি.। অন্যদিকে মহামান্য সুপ্রীম কোর্টের এক নির্দেশ অনুযায়ী: “We are not inclined to intervene in the decisions of the ad hoc committee. Therefore, the Rule stands discharged, and the stay granted earlier is hereby revoked and set aside. The judgment and order should be communicated promptly to the relevant parties.” এই ধারণা পাওয়া যায়। এ অবস্থায় প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমানের সাময়িক বরখাস্তাদেশ প্রত্যাহার করে তাকে তার পূর্বের পদে বহাল করতে একটি প্রভাবশালী মহল চেষ্টায় লিপ্ত রয়েছেন বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে। আর এটি করতে গিয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জাহানারা আক্তারকে “ফিমেল না হয়ে মেল হলে আপনাকে টেনে ছিড়ে ফেলতাম” এমন অসম্মানজনক কথা অন্যান্য সহকারী শিক্ষক ও একজন ‘ফিমেল’ অতিথির সামনেই বলা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিদ্যালয় পরিচালনায় ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগে অভিযুক্ত মিজানুর রহমানকে পুনর্বাসন করতে তার হয়ে কাজ করছেন কারা? দেখুন পরের সংখ্যায়। 

Leave Your Comments