নিজস্ব প্রতিবেদক
কথিত প্রাচীন সীমানা পিলার ও শতবর্ষী কয়েনকে পুঁজি করে দেশের প্রভাবশালী ও আর্থিকভাবে সচ্ছল ব্যক্তিদের টার্গেট করে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে একটি সংঘবদ্ধ প্রতারণা চক্র। অনুসন্ধান ও ভুক্তভোগীদের সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে, আহাদুল ইসলাম দুলাল ওরফে এইচএম দুলাল খান (চান্দু) এবং আব্দুল মনসুর ওরফে ইব্রাহিম মুসার নেতৃত্বে পরিচালিত এই চক্র কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।
ভুক্তভোগীদের মধ্যে অন্যতম নাদের খান। তার অভিযোগ, এই প্রতারক চক্রের ফাঁদে পড়ে তিনি প্রায় ৮ কোটি ২০ লাখ টাকা হারিয়েছেন। নাদের খানের মতো শিক্ষিত ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিও প্রতারণার শিকার হওয়ায় চক্রটির কৌশল ও পরিকল্পনার গভীরতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
একাধিক ভুক্তভোগী, প্রতারণার পরিধি বিস্তৃত
নাদের খানের পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের তালিকায় রয়েছেন মো. শাহ আলম, মামুন খন্দকার, রসনা বেগম, আসলাম চৌধুরী ও মালিক সাহেবসহ আরও অনেকে। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতারকরা ধাপে ধাপে আস্থা তৈরি করে বড় অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিত।
শুরুতে নিজেদের পরিচয় দিত সাবেক সরকারি কর্মকর্তা, প্রত্নতত্ত্ব গবেষক কিংবা আন্তর্জাতিক কালেক্টরের স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে। কথাবার্তা, কাগজপত্র দেখানো ও আত্মবিশ্বাসী আচরণে অনেকেই সহজেই বিশ্বাস করে ফেলতেন।
ছোট লেনদেনে আস্থা, বড় অঙ্কে প্রতারণা
ভুক্তভোগীরা জানান, প্রথমে অল্প অঙ্কের টাকা লেনদেন করে বিশ্বাস অর্জন করা হতো। এরপর ‘বিদেশি ক্রেতা আসছে’, ‘সরকারি ছাড়পত্র পাওয়া গেছে’ কিংবা ‘চূড়ান্ত ডিলের আগে শেষ পরিশোধ’—এমন নানা অজুহাতে ধাপে ধাপে বড় অঙ্কের অর্থ দাবি করা হতো।
একপর্যায়ে আইনগত জটিলতার গল্প শোনানো হতো এবং সবকিছু নিরাপদ বলে আশ্বস্ত করা হতো। পরে হঠাৎ করেই যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যেত, ফলে টাকা ফেরত পাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে পড়ত।
পিলার ও কয়েনেই প্রতারণার নাটক
অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতারণার অন্যতম হাতিয়ার ছিল কথিত প্রাচীন সীমানা পিলার। কখনো এগুলো ব্রিটিশ আমলের সীমান্তচিহ্ন, কখনো কোনো প্রাচীন রাজ্যের নিদর্শন হিসেবে দেখানো হতো। বাস্তবে এসব পিলারের বেশিরভাগই ছিল সাধারণ পাথর বা আধুনিকভাবে তৈরি স্তম্ভ।
বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে দেখানো হতো পুরোনো মানচিত্রের কপি, হলদে কাগজে ছাপানো নথি ও ভুয়া সিলমোহর।
একইভাবে প্রাচীন কয়েনও ব্যবহার করা হতো প্রতারণার কাজে। মুঘল বা সুলতানি আমলের স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা বলে দাবি করে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা হতো। বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সাধারণ ধাতুকেও সহজেই শতবর্ষী মুদ্রার মতো বানানো সম্ভব।
আইনের দুর্বলতায় সুযোগ
আইনশৃঙ্খলা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ আইন থাকলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে। কোন বস্তু বৈধভাবে কেনাবেচা করা যায় আর কোনটি রাষ্ট্রীয় সম্পদ—এই বিভ্রান্তির সুযোগ নিয়েই প্রতারকরা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
ইতিহাস ও ঐতিহ্যের আবরণে প্রতারণা চালানো হলে দ্রুত লাভের আশায় মানুষ সতর্কতা হারিয়ে ফেলে বলেও মনে করেন তারা।
দুলালের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা
সূত্রে জানা গেছে, আহাদুল ইসলাম দুলাল ওরফে এইচএম দুলাল খান (চান্দু)-এর বিরুদ্ধে একাধিক প্রতারণার মামলা রয়েছে।
মিরপুর মডেল থানায় দায়ের করা একটি মামলায় (এফআইআর নং-৬, ৬ নভেম্বর ২০১২) দণ্ডবিধির ৪২০, ৪৬৫, ৪৬৬, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১, ৪০৬ ও ৩৪ ধারায় তাকে অভিযুক্ত করা হয় এবং গ্রেপ্তার করা হয়।
এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ সদর থানায় দায়ের করা আরেকটি মামলায় (এফআইআর নং-১১, ১০ জুন ২০০৮) দণ্ডবিধির ৪২০ ও ৪০৬ ধারায় অভিযোগ রয়েছে।
সূত্র আরও জানায়, দুলাল ও আব্দুল মনসুর বিভিন্ন সময় ভিন্ন ভিন্ন নাম ব্যবহার করে যৌথভাবে এই প্রতারণা সিন্ডিকেট পরিচালনা করেছেন।
নীরবতার সুযোগে বেপরোয়া চক্র
ভুক্তভোগীরা জানান, সামাজিক সম্মান ও পারিবারিক মর্যাদার কথা চিন্তা করে অনেকেই প্রতারণার শিকার হওয়ার পর আইনের আশ্রয় নিতে পারেননি। এই নীরবতাই চক্রটিকে আরও বেপরোয়া করে তুলেছে।
নাদের খানসহ অন্যান্য ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা বলছে, এই চক্রের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন প্রতারণা ঠেকাতে আইনি ব্যবস্থার পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানোই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
ভুক্তভোগীদের প্রত্যাশা—তাদের অভিজ্ঞতা অন্যদের সতর্ক করবে, যাতে ভবিষ্যতে আর কেউ কথিত প্রাচীন সম্পদের লোভে সর্বস্ব হারিয়ে না ফেলে।