ওয়াসার জোন-৭ যেন মামুনুরের ‘মধুশালা’ পদোন্নতি থেকে বিল জালিয়াতি, সবখানেই দুর্নীতির থাবা

Date: 2026-03-07
news-banner

বশির আহমেদ সানি: 

সরকারি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারে বসে ক্ষমতার আপব্যবহার আর দুর্নীতির পাহাড় গড়ার অভিযোগ যেন থামছেই না। এবার বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছেন ঢাকা ওয়াসার রাজস্ব জোন-৭-এর রাজস্ব কর্মকর্তা মো. মামুনুর রশিদ। অভিযোগ রয়েছে, ২২ লাখ টাকার বিনিময়ে পদোন্নতি বাগিয়ে নেওয়া এই কর্মকর্তা এখন জোন-৭-কে বানিয়ে ফেলেছেন অনিয়মের অভয়ারণ্য। প্রভাবশালী নেতার আশীর্বাদ আর অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে তিনি গড়ে তুলেছেন এক দুর্ভেদ্য সিন্ডিকেট।

অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীস্থ জোন-৭ কার্যালয়ে সরেজমিনে পৌঁছায় অনুসন্ধানকারী দল। গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতি টের পেয়েই তড়িঘড়ি করে বন্ধ করে দেওয়া হয় অফিসের প্রধান ফটক। নামফলকহীন ও মাস্ক পরিহিত একদল নিরাপত্তাকর্মী তর্কে জড়িয়ে পড়েন সাংবাদিকদের সাথে। কোনো প্রকার সদুত্তর না দিয়েই কর্মকর্তাদের রুমে যাওয়ার পথ আটকে দেওয়া হয়। প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি দপ্তরে কেন এই লুকোচুরি? কাকে আড়াল করার চেষ্টায় এই রুদ্ধদ্বার পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে?

অনুসন্ধানে মামুনুর রশিদের তথাকথিত ‘সাইড’ বা ‘কোড’ বাণিজ্যের চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, রাজস্ব পরিদর্শকদের পছন্দের এলাকা বা লাভজনক ‘কোড’ দেওয়ার বিনিময়ে ২ থেকে আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেন তিনি। যারা এই টাকা দিতে অপরাগ, তাদের কপালে জোটে মানসিক হয়রানি কিংবা মাসের পর মাস দায়িত্বহীন অবস্থায় বসিয়ে রাখা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে জোন-৭-এর একজন রাজস্ব পরিদর্শক বলেন, “মামুন স্যার সরাসরি আমার কাছে ২ লাখ টাকা ঘুষ চেয়েছেন। এখানে সাইড বাণিজ্য এখন ওপেন সিক্রেট।”

অনিয়মের জাল আরও গভীরে বিস্তৃত। নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অর্থের বিনিময়ে বাণিজ্যিক সংযোগকে কাগজে-কলমে ‘আবাসিক’ হিসেবে দেখানো হচ্ছে। ঢাকা ওয়াসার নিয়ম অনুযায়ী, বাণিজ্যিক সংযোগে প্রতি ইউনিট পানির দাম ৫৬ টাকা, যেখানে আবাসিক হারে নেওয়া হয় মাত্র ২০ টাকা। অন্তত ১০টি বিলে এমন জালিয়াতির অকাট্য প্রমাণ পাওয়া গেছে। এতে পকেট ভারী হচ্ছে কর্মকর্তাদের, আর সরকার হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব।

রাজস্ব জোন-৭-এ আগের কর্মকর্তা জাকির হোসেন প্রধানিয়ার আমলের ফাইলগুলো পুনরায় সচল করে গ্রাহকদের ওপর আর্থিক চাপ সৃষ্টির অভিযোগও রয়েছে। সংশ্লিষ্ট নথি ও ভুক্তভোগীদের দাবি, মামুনুর রশিদের দাবিকৃত অর্থ পরিশোধ না করলে সংযোগের ধরন পরিবর্তন করে উচ্চ হারে বিল চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে অনেক গ্রাহকের মাসিক বিল আগের তুলনায় তিনগুণ পর্যন্ত বেড়ে গেছে।

ওয়াসা আইন-২০০৯ অনুযায়ী দাপ্তরিক গোপন নথিপত্র নাড়াচাড়ার অধিকার কেবল সরকারি কর্মচারীদের থাকলেও, মামুনুর রশিদ তার ব্যক্তিগতভাবে নিয়োগ দেওয়া ‘ডুপ্লিকেট’ বা অনিবন্ধিত ব্যক্তিদের দিয়ে অফিসের কাজ করাচ্ছেন। এসব বহিরাগতরা নিয়মিত অফিসে বসে ফাইল নিয়ন্ত্রণ ও আপ্যায়নের আসর বসান। এতে অফিসের গোপনীয়তা যেমন বিঘ্নিত হচ্ছে, তেমনি সাধারণ মানুষও প্রতারণার শিকার হচ্ছেন।
ঢাকা ওয়াসার মতো একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে এমন প্রকাশ্য সিন্ডিকেট আর লুটতরাজ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কি এই অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে, নাকি মামুনুর রশিদের এই অনিয়মই জোন-৭-এর অলিখিত নিয়মে পরিণত হবে?


সাধারণ এক কৃষক পরিবারে জন্ম নিয়ে কীভাবে বিপুল বিত্ত-বৈভবের মালিক হলেন ঢাকা ওয়াসার এই বিতর্কিত কর্মকর্তা? অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের আগামী পর্বে প্রকাশিত হবে রাজস্ব কর্মকর্তা মামুনুর রশিদের অবৈধ উপার্জনে গড়া সম্পদের আদ্যোপান্ত

Leave Your Comments