নিজস্ব প্রতিবেদক :
নানা প্রতিকূলতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং তীব্র আর্থিক সংকটের মধ্যেও মানবিকতা ও ধর্মীয় দায়িত্ববোধকে আঁকড়ে ধরে টিকে আছে সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলার শুভগাছা রোকন সিরাজ হাফিজিয়া মাদরাসা ও লিল্লাহ বোডিং। সীমাহীন অভাব-অনটনের মাঝেও প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ না করে চালিয়ে নেওয়ার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এই সংগ্রাম দীর্ঘদিন ধরে টিকিয়ে রাখতে স্থানীয়দের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবানদের সহযোগিতা এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।
জানা যায়, যমুনা নদীর ভয়াল ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত শুভগাছা এলাকায় ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এই মাদরাসাটি। নদীভাঙনে সর্বস্ব হারানো অসহায় মানুষের সন্তানদের ধর্মীয় শিক্ষার সুযোগ করে দিতে স্থানীয় বাসিন্দা মো. রোকনুজ্জামান নিজ জমি দান করেন। তার এই মানবিক উদ্যোগকে বাস্তবে রূপ দেন মাদরাসার মুহতামিম মাওলানা মো. হানজালা মাহমুদী। শুরুতে ছোট পরিসরে যাত্রা শুরু হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি এলাকার দরিদ্র শিশুদের জন্য আশার আলো হয়ে ওঠে।
বর্তমানে মাদরাসাটি কোনো সরকারি অনুদান বা বড় কোনো দাতা সংস্থার পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। স্থানীয়দের মুস্টি চাল, যাকাত, ফিতরা এবং স্বল্প পরিমাণ দান-অনুদানের ওপর নির্ভর করেই চলছে এর যাবতীয় কার্যক্রম। শুভগাছা ওয়াবদা বাঁধ সংলগ্ন এই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের জন্য অতি সীমিত পরিসরে খাবারের ব্যবস্থাও করা হয়, যা অনেক সময় প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল হয়ে পড়ে।
মাদরাসার মুহতামিম মাওলানা মো. হানজালা মাহমুদী জানান, “চরম আর্থিক সংকটের কারণে অনেক সময় শিক্ষার্থীদের খাবারের ব্যবস্থা করাও কঠিন হয়ে পড়ে। তখন আমি ধর্মীয় পদ্ধতিতে ছোটখাটো চিকিৎসা (দোয়া-দরুদ) করে যে সামান্য অর্থ পাই, তা দিয়েই কোনোভাবে তাদের খাবারের ব্যবস্থা করি।” তিনি আরও বলেন, “অসংখ্য কষ্টের মধ্যেও আমরা কোরআনের আলো ছড়িয়ে দিতে চাই। এই প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে গেলে এলাকার এতিম ও দরিদ্র শিশুদের জন্য আর কোনো সুযোগ থাকবে না।”
বর্তমানে মাত্র তিনজন শিক্ষক দিয়ে অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থীকে মক্তব ও হেফজ শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। অধিকাংশ শিক্ষার্থীই দরিদ্র ও অসহায় পরিবারের সন্তান। অর্থাভাবে শিক্ষকদের নিয়মিত বেতন দেওয়া সম্ভব না হলেও, মানবিক দায়বদ্ধতা ও ধর্মীয় অনুপ্রেরণা থেকেই তারা বিনা পারিশ্রমিকে পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের এই ত্যাগ ও আন্তরিকতা প্রতিষ্ঠানটিকে টিকিয়ে রাখার অন্যতম প্রধান শক্তি।
স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তি আলহাজ মো. আমির হোসেন বলেন, “এই এলাকা যমুনার ভাঙনে বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অধিকাংশ মানুষই আর্থিকভাবে দুর্বল। তাই বেসরকারি উদ্যোগে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালিয়ে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন। তারপরও এই মাদরাসাটি এলাকার শিশুদের ধর্মীয় শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে, যা অত্যন্ত প্রশংসনীয়।”
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, একটি সাধারণ টিনশেড ঘরে গাদাগাদি করে শিক্ষার্থীরা বসে পড়াশোনা করছে। রান্নাঘরটিও অত্যন্ত সাধারণ, যেখানে সীমিত খাদ্যসামগ্রী দিয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য খাবার প্রস্তুত করা হয়। অনেক সময় পর্যাপ্ত খাবার না থাকলেও শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ধৈর্য ও ত্যাগের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে।
স্থানীয়দের মতে, এই প্রতিষ্ঠানটি শুধু একটি মাদরাসা নয়, বরং এলাকার অসহায় শিশুদের জন্য একটি আশ্রয়স্থল। তাই এটি টিকিয়ে রাখতে সমাজের বিত্তবান, প্রবাসী ও দানশীল ব্যক্তিদের এগিয়ে আসা অত্যন্ত জরুরি। তাদের সহযোগিতা পেলে শিক্ষার্থীদের জন্য উন্নত খাবার, আবাসন ও শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে সবাই এগিয়ে এলে শুভগাছা রোকন সিরাজ হাফিজিয়া মাদরাসা ও লিল্লাহ বোডিং একদিন একটি পূর্ণাঙ্গ ও আদর্শ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে, যেখানে দরিদ্র ও এতিম শিশুরা আলোকিত ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যেতে পারবে।