দেশে কিশোর অপরাধ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। বিশেষ করে ১৬ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিশুরাই হত্যা, ধর্ষণসহ নানা গুরুতর অপরাধে বেশি জড়িয়ে পড়ছে—এমন তথ্য উঠে এসেছে আইন কমিশনের এক গবেষণায়। দেশের দুটি শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে থাকা শিশুদের ওপর এই গবেষণা পরিচালনা করা হয়।
আইন কমিশনের আয়োজিত একাধিক সেমিনারে অংশ নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, বর্তমান শিশু আইনে নির্ধারিত বয়সসীমা পুনর্বিবেচনা করা জরুরি। বিচারক, পাবলিক প্রসিকিউটর, আইনজীবী, পুলিশ, সমাজকর্মীসহ মোট ১৫৪ জন অংশগ্রহণকারীর মধ্যে ৯৪ শতাংশই শিশু আইনের বয়সসীমা পরিবর্তনের পক্ষে মত দিয়েছেন। তাদের মতে, বিদ্যমান আইনে নানা অসঙ্গতি রয়েছে, যা দ্রুত সংশোধন করা প্রয়োজন।
গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে অবস্থিত দুই শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র—গাজীপুরের টঙ্গী ও যশোরের পুলেরহাট—মিলে ৮৭৩ জন শিশু অবস্থান করছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি, অর্থাৎ ৩৯৩ জনের বয়স ১৬ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে। এছাড়া ১২ থেকে ১৬ বছর বয়সী ২৫০ জন এবং ১৮ বছরের বেশি বয়সীও রয়েছে ৬৯ জন।
অপরাধের ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়—
-
হত্যার অভিযোগে ২০৫ জন
-
নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে ২০৪ জন
-
চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ে ১৫৩ জন
-
এছাড়া মাদক, অপহরণ, মারামারি ও অন্যান্য অপরাধেও জড়িত রয়েছে অনেকে
এদিকে, শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রগুলোর ধারণক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি শিশু অবস্থান করছে। টঙ্গীর কেন্দ্রটির ধারণক্ষমতা ৩০০ হলেও সেখানে রয়েছে ৫৭৮ জন শিশু, যা ব্যবস্থাপনার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
আইন বিশ্লেষক ও অবসরপ্রাপ্ত বিচারক ফউজুল আজিম বলেন, গবেষণায় শিশুদের অপরাধে জড়ানোর কারণ স্পষ্টভাবে উঠে আসেনি। তিনি মনে করেন, এ বিষয়ে পৃথক ও গভীর গবেষণা প্রয়োজন। একইসঙ্গে আইনি কাঠামোর সীমাবদ্ধতা দূর করে দ্রুত বিচার ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।
অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দিন বলেন, পারিপার্শ্বিক নানা কারণে কিশোররা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তবে সংশোধনাগারগুলোতে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা না থাকায় তারা সংশোধিত না হয়ে বরং আরও অপরাধপ্রবণ হয়ে উঠছে। তাই উন্নত বিশ্বের মতো আধুনিক পুনর্বাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দেন তিনি।
এছাড়া, দেশে বিভিন্ন আইনে শিশুর সংজ্ঞা নিয়েও বিভ্রান্তি রয়েছে। শিশু আইন অনুযায়ী ১৮ বছরের নিচে সবাই শিশু হলেও, অন্য কিছু আইনে বয়সসীমা ভিন্নভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে একই বয়সের ব্যক্তিকে কোথাও শিশু, কোথাও প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে—যা আইনি জটিলতা তৈরি করছে।
সার্বিক পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের অপরাধ থেকে দূরে রাখতে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি শিশু আইনের অসঙ্গতি দূর করে যুগোপযোগী সংস্কার এখন সময়ের দাবি।