‎ঢাকা ওয়াসায় সিন্ডিকেটের রাজত্ব

Date: 2026-03-14
news-banner

‎মান্নান, ইকবাল ও শরিফুলের নেতৃত্বে কোটি টাকার কোড বাণিজ্যের অভিযোগ

মোঃ বশির আহমেদ সানি :
‎ঢাকা ওয়াসার একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের দাপটে কর্মকর্তা-কর্মচারী ও গ্রাহকেরা কার্যত জিম্মি হয়ে পড়েছেন—এমন অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে রয়েছেন রাজস্ব পরিদর্শক মোঃ আব্দুল মান্নান। তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন রাজস্ব পরিদর্শক ইকবাল আহমেদ ও মোঃ শরিফুল ইসলাম পাটোয়ারী।
‎অভিযোগ রয়েছে, গত ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নিজেকে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের (বিএনপি) সমর্থক হিসেবে পরিচয় দিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই তারা-এ প্রভাব বিস্তার করেন। এরপর থেকে কোড বণ্টন, সাইড নিয়ন্ত্রণ ও বিভিন্ন নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী চক্র গড়ে তোলেন তারা।
‎অনুসন্ধানে জানা গেছে, নিয়ম অনুযায়ী এক জন পরিদর্শকে ৭০০–১০০০ হোল্ডিংয়ের দায়িত্ব দেওয়ার কথা থাকলেও সেখানে সিন্ডিকেটের প্রভাব খাটিয়ে কাউকে ২৫০–৪০০ হোল্ডিং দিয়ে আবার নিজেদের ঘনিষ্ঠদের ৯০০–১০০০ হোল্ডিংয়ের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, সাইড বা কোড পেতে হলে সিন্ডিকেট সংশ্লিষ্টদের নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিতে হয়, যার মূল হতে আব্দুল মান্নান।
‎সূত্র জানায়, গত তিন মাসে শুধুমাত্র কোড বাণিজ্য থেকেই এই সিন্ডিকেট প্রায় ৩ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ভুক্তভোগী রাজস্ব পরিদর্শক বলেন, “এখানে মান্নান সাহেবের কথাই শেষ কথা। সাইড পেতে হলে তাকে টাকা দিতেই হয়। এটি এখন ওপেন সিক্রেট।”
‎জানা গেছে, ঢাকা ওয়াসায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত থাকলেও মাঠ পর্যায়ের কাজগুলো পরিচালিত হচ্ছে অনিয়মিতভাবে। নিয়ম ভেঙে ডাটা এন্ট্রি অপারেটর ও অন্যান্য অদক্ষ কর্মীদের দিয়ে রাজস্ব আদায়ের কাজ করানো হচ্ছে। বিনিময়ে এসব কর্মীরা সিন্ডিকেটকে নিয়মিত মাসোহারা দিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, যাদের মূল দায়িত্ব রাজস্ব আদায়, তাদের অনেককেই বসিয়ে রেখে বেতন দেওয়া হচ্ছে।
‎নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মোঃ আলতাফ হোসেনের, মোঃ আনোয়ার, আহসান উল্লাহ এবং নুরুজ্জামান আকন্দ এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। এমনকি অবসরোত্তীর্ণের কাছাকাছি অবস্থানে থাকা এক নারী কর্মীর নাম দেখিয়ে ডুপ্লির মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।
‎অভিযোগ রয়েছে, আব্দুল মান্নান এবং ইকবাল আহমেদ দুইটি কোড নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখে রাজস্ব আদায়ে অনিয়ম করছেন। অন্যদিকে শরিফুল ইসলাম পাটোয়ারী একটি ভিআইপি এলাকায় রাজস্ব ফাঁকির সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে।
‎এছাড়া ঢাকা ওয়াসার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুস সালাম ব্যাপারী ও সিবি-এ ৩১৮৫-এর সভাপতি আজিজুল আলম খান এবং সাধারণ সম্পাদক মনির হোসেন পাটোয়ারীর সঙ্গে এই সিন্ডিকেটের ঘনিষ্ঠ যোগসাজশ রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের নিয়মিত মাসোহারা দিয়ে সিন্ডিকেটটি সুরক্ষা পাচ্ছে বলেও দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
‎এই সিন্ডিকেটের অনিয়মের বিষয়ে বক্তব্য জানতে প্রতিবেদক ঢাকা ওয়াসার অফিসে গেলে পরিচয় জানার পরই অফিসের মূল ফটক বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ সময় মুখে মাস্ক পরা ও নেমপ্লেটবিহীন তিনজন নিরাপত্তাকর্মী প্রতিবেদককে হেনস্তার চেষ্টা করেন। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
‎নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওয়াসার এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, একটি নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটের কারণে ওয়াসার কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সাধারণ গ্রাহকেরা কার্যত জিম্মি হয়ে পড়েছেন।
‎ঢাকা ওয়াসায় চলমান এই অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগীরা।
‎তিন পর্বের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের আজকের প্রথম পর্ব, পরবর্তী পর্ব পড়তে চোখ এখন বার্তা বিচিত্রার পাতায়।

Leave Your Comments