মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের কারাজ শহরে অবস্থিত মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম উচ্চতম সেতু ‘বি১ ব্রিজ’ ধ্বংস হয়ে গেছে। একই সঙ্গে দেশজুড়ে একাধিক বেসামরিক স্থাপনায় হামলার অভিযোগ উঠেছে, যা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়ছে।
সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) কারাজের ৪৪৬ ফুট উচ্চতার নির্মাণাধীন বি১ সেতুতে তিনটি বোমা নিক্ষেপ করা হয়। এতে সেতুটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। এই সেতুটি একটি বেসামরিক মহাসড়ক প্রকল্পের অংশ ছিল বলে জানা গেছে, যদিও যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, এটি ক্ষেপণাস্ত্র পরিবহনে ব্যবহৃত হচ্ছিল।
এই হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ সেতু ধ্বংসের বিষয়টি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি লিখেন, “ইরানের সবচেয়ে বড় সেতুটি আর কখনও ব্যবহার হবে না। এখনই চুক্তিতে না এলে ইরানের কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।” এর আগে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি ইরানকে ‘প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে দেয়ার’ হুমকিও দেন, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
ইরানের রাজধানী তেহরানেও হামলার ঘটনা ঘটেছে। সেখানে শতবর্ষ পুরোনো চিকিৎসা গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘পাস্তুর ইনস্টিটিউট’ ধ্বংস হয়ে গেছে। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হোসেইন কেরমানপুর এই হামলাকে “আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আঘাত” হিসেবে বর্ণনা করেন। প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে প্লেগ, কলেরা, যক্ষ্মাসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগ নিয়ে গবেষণা এবং টিকা উন্নয়নে কাজ করছিল।
এছাড়া তেহরানে শান্তি আলোচনায় যুক্ত এক শীর্ষ আলোচকের পরিবারের ওপরও হামলার অভিযোগ উঠেছে। এই হামলায় সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল খারাজি গুরুতর আহত হয়েছেন এবং তার স্ত্রী নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মাশহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছেও বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি মানবাধিকার সংস্থার তথ্যমতে, চলমান সংঘাতে এখন পর্যন্ত ১,৬০০ জনের বেশি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ২৪৪ জন শিশু রয়েছে। তেহরান সিটির এক মুখপাত্র জানান, অন্তত ৩৩ হাজার আবাসিক ইউনিট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অন্যদিকে, ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী পাল্টা হামলার দাবি করেছে। তারা জানিয়েছে, বাহরাইনে একটি অ্যামাজন ক্লাউড ডেটা সেন্টার লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। এর আগে তারা মাইক্রোসফট, গুগল ও অ্যাপলের মতো মার্কিন প্রযুক্তি অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করার হুমকিও দিয়েছিল।
এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, তারা ইরানের হামলা প্রতিহত করেছে। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, তারা ১৯টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ২৬টি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। সংঘাত শুরুর পর থেকে মোট ৪৫৭টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ২,০৩৮টি ড্রোন প্রতিহত করা হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই হামলা-পাল্টা হামলার ফলে পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে বড় ধরনের যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দ্রুত উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানিয়েছে।