ম্যারাডোনার জাদু, ক্রুইফের আক্ষেপ আর রোনাল্ডোর রহস্যে বিশ্বকাপের নতুন যুগ

Date: 2026-05-13
news-banner

বিশ্বকাপের দ্বিতীয় অধ্যায় মূলত ফুটবলের রূপান্তরের গল্প—টোটাল ফুটবলের জন্ম থেকে শুরু করে আধুনিক বিশ্বকাপের বিস্তৃতি ও বাণিজ্যিক যুগে প্রবেশ পর্যন্ত এক দীর্ঘ ইতিহাস।

বিশ্বকাপের দ্বিতীয় অধ্যায়: পরিবর্তন, তারকা ও আধুনিকতার উত্থান

বিশ্বকাপের প্রথম অধ্যায়ে যেমন ছিল জন্ম ও প্রতিষ্ঠার গল্প, দ্বিতীয় অধ্যায়ে এসে ফুটবল হয়ে ওঠে আরও রঙিন, আরও বৈশ্বিক। সত্তরের দশক থেকে নব্বইয়ের শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ শুধু মাঠের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বদলে দিয়েছে ফুটবলের দর্শন, কৌশল ও বাণিজ্যিক পরিধিও। ১৩ দল নিয়ে শুরু হওয়া টুর্নামেন্ট এই সময়েই ধীরে ধীরে পৌঁছে যায় ৩২ দলের মহাযজ্ঞে।

১৯৭৪ বিশ্বকাপে নতুন এক ফুটবল ধারণা নিয়ে হাজির হয় নেদারল্যান্ডস। ‘টোটাল ফুটবল’ নামে পরিচিত সেই কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন কিংবদন্তি ইয়োহান ক্রুইফ। মাঠের যেকোনো জায়গায় খেলোয়াড়দের অবাধ বিচরণ আর পজিশন বদলের এই ফুটবল দ্রুতই মুগ্ধ করে বিশ্বকে। তবে শেষ হাসি হেসেছিল পশ্চিম জার্মানি। নিজেদের মাঠে নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জেতে জার্মানরা। অধিনায়ক ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ারের লিবেরো ভূমিকাও ফুটবলের কৌশলগত চিন্তায় নতুন মাত্রা যোগ করে।

চার বছর পরও ভাগ্য সহায় হয়নি ডাচদের। ১৯৭৮ বিশ্বকাপে আবারও ফাইনালে হেরে যায় তারা। নিজেদের মাটিতে প্রথমবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় আর্জেন্টিনা। টুর্নামেন্টের সেরা তারকা হয়ে ওঠেন মারিও কেম্পেস। সেই আসরে খেলেননি ক্রুইফ; ব্যক্তিগত নিরাপত্তাজনিত কারণে তিনি নিজেকে সরিয়ে নেন বিশ্বকাপ থেকে এবং পরে জাতীয় দল থেকেও বিদায় জানান।

১৯৮২ বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৪-এ। ফাইনালে পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে তৃতীয় শিরোপা জেতে ইতালি। সেই আসরের সবচেয়ে আলোচিত চরিত্র ছিলেন পাওলো রসি—বিতর্কিত অতীত পেছনে ফেলে তিনি হয়ে ওঠেন টুর্নামেন্টের নায়ক, সর্বোচ্চ গোলদাতা ও সেরা খেলোয়াড়।

১৯৮৬ বিশ্বকাপ ছিল পুরোপুরি দিয়েগো ম্যারাডোনার গল্প। আর্জেন্টিনাকে দ্বিতীয়বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করার পথে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তিনি উপহার দেন ‘হ্যান্ড অব গড’ ও ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’। বিতর্ক ও প্রতিভার মিশেলে গড়া সেই আসরের গোল্ডেন বলও জেতেন তিনি।

১৯৯০ বিশ্বকাপ ছিল রক্ষণাত্মক ফুটবলের যুগ। তবে ইতিহাস গড়ে ক্যামেরুন প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছায়। আর তৃতীয়বারের মতো শিরোপা জেতে পশ্চিম জার্মানি, আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে। সেই আসরে ম্যারাডোনার কান্না হয়ে ওঠে এক যুগের শেষের প্রতীক।

১৯৯৪ বিশ্বকাপ প্রথমবার অনুষ্ঠিত হয় যুক্তরাষ্ট্রে এবং জনপ্রিয়তায় নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়। তবে ফাইনালে ইতালির রবার্তো ব্যাজিওর পেনাল্টি মিসে শিরোপা জেতে ব্রাজিল। একই সঙ্গে বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ফাইনাল নিষ্পত্তি হয় টাইব্রেকারে।

১৯৯৮ বিশ্বকাপে দল বাড়িয়ে ৩২-এ উন্নীত হয় টুর্নামেন্ট। নিজেদের মাটিতে প্রথমবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় ফ্রান্স। ফাইনালে ব্রাজিলকে হারিয়ে জোড়া গোল করেন জিনেদিন জিদান। পুরো আসরের তারকা ছিলেন রোনালদো নাজারিও, যিনি ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সে জেতেন সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার।

এই সময়কালেই বিশ্বকাপ শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়, বরং হয়ে ওঠে বৈশ্বিক সংস্কৃতি, তারকা জন্মের মঞ্চ এবং আধুনিক ফুটবলের ভিত্তি।

Leave Your Comments