যে মাটিতে কেটেছে জীবনের ছয়টি দশক, যে আঙিনায় গড়ে উঠেছে প্রজন্মের পর প্রজন্মের সংসার, যে ভিটেতে মিশে আছে পূর্বপুরুষের স্মৃতি, সেই মাটির অধিকার নিয়েই আজ অনিশ্চয়তায় ১০টি পরিবার। দীর্ঘ ৬৬ বছরের বসতভিটে ঘিরে বিরোধের এমন পরিস্থিতিতে এবার ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় সাংবাদিকদের সামনে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছেন তাঁরা।
পঞ্চগড়ের বোদা পৌর শহরের ঝিনুকনগর এলাকায় আদালতে বিচারাধীন একটি জমি নিয়ে বোদা সরকারি পাইলট মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে হয়রানি, অপপ্রচার ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা।
বুধবার (৪ নভেম্বর) বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে জমি-সংক্রান্ত মানববন্ধন কর্মসূচি পালনের দুই দিন পর শুক্রবার (৬ নভেম্বর) দুপুরে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন ভুক্তভোগী ১০ পরিবারের সদস্যরা। তাঁদের অভিযোগ, বিচারাধীন একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের সামনে এনে একপাক্ষিক বক্তব্য প্রচার করা হয়েছে। এতে তাঁদের সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করার পাশাপাশি জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন পরিবারের সদস্য মো. মনজুরুল হক।
লিখিত বক্তব্যে তাঁরা জানান, ১৯৬১ সালে তাঁদের প্রয়াত পিতা আবু নুর মোহাম্মদ আব্দুল গফুর বোদা পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের ঝিনুকনগর এলাকায় ২৪৯ শতক জমি ক্রয় করেন। সেই থেকে পরিবারটি ওই জমিতে বসবাস করে আসছে। সময়ের সঙ্গে সেখানে গড়ে উঠেছে বসতবাড়ি, বেড়ে উঠেছে সন্তান-সন্ততি, আর জমে উঠেছে কয়েক প্রজন্মের জীবনের অসংখ্য স্মৃতি। বাড়ির পাশেই অবস্থিত বোদা সরকারি পাইলট মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ।
পরিবারগুলোর দাবি, জমি ক্রয়ের পর থেকেই বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁদের নিজস্ব জায়গায় এবং তাঁরা নিজেদের ক্রয়কৃত জমিতে ঘরবাড়ি নির্মাণ করে বসবাস করে আসছেন। কিন্তু ২০২৫ সালে বিদ্যালয়ের একটি নোটিশের মাধ্যমে তাঁরা জানতে পারেন, এসএ রেকর্ডের নকশায় তাঁদের ক্রয়কৃত জমির ৩৫ শতক বিদ্যালয়ের নামে অন্তর্ভুক্ত দেখানো হয়েছে। তাঁদের দাবি, ওই জমির মালিকানার পক্ষে বিদ্যালয়ের কোনো বৈধ দলিল নেই।
বিষয়টি জানার পর তাঁরা নকশা সংশোধনের দাবিতে ২০ মার্চ ২০২৫ তারিখে বোদা দেওয়ানি আদালতে মামলা দায়ের করেন। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন। ইতোমধ্যে আদালতের মাধ্যমে অ্যাডভোকেট কমিশনার নিয়োগ করে সরেজমিন তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে এবং তদন্ত প্রতিবেদনও দাখিল করা হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
তবে আদালতে বিচারিক প্রক্রিয়া চলমান থাকা অবস্থায় গত ৪ নভেম্বর বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের নিয়ে মানববন্ধন করে। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ, সেখানে জমির মালিকানা নিয়ে একপাক্ষিক ও বিভ্রান্তিকর তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। তাঁদের প্রশ্ন, যে বিষয়টির নিষ্পত্তি আদালতের হাতে, সেখানে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের কেন এমন বিরোধের অংশ করা হচ্ছে?
পরিবারগুলোর আরও অভিযোগ, আদালত ওই জমিতে কোনো নিষেধাজ্ঞার আদেশ না দিলেও বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. রুবেল নিষেধাজ্ঞা রয়েছে বলে ভুল তথ্য দিয়ে পুলিশকে ব্যবহার করে তাঁদের হয়রানি করেছেন। গত ২৯ অক্টোবর কয়েকজন পুলিশ সদস্য তাঁদের বাড়িতে গিয়ে জমি-সংক্রান্ত বিষয়ে খোঁজখবর নেন বলেও লিখিত বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে মনজুরুল হক বলেন, ‘আমরা প্রায় ৬৬ বছর ধরে আমার বাবার কেনা জমিতে বসবাস করে আসছি। জমি কেনার পর থেকেই বিদ্যালয় তাদের জায়গায় আর আমরা আমাদের জায়গায় ঘরবাড়ি করে বসবাস করছি। ২০২৫ সালে জানতে পারি, এসএ রেকর্ডের নকশায় আমাদের ৩৫ শতক জমি বিদ্যালয়ের নামে দেখানো হয়েছে। এরপর আমরা আদালতের শরণাপন্ন হয়েছি। মামলাটি বিচারাধীন এবং অ্যাডভোকেট কমিশনার তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন।’
তিনি আবেগাপ্লুত কণ্ঠে আরও বলেন, ‘আমরা কারও সঙ্গে বিরোধ চাই না, কারও অধিকার কেড়ে নিতে চাই না। আমাদের বাবার কেনা জমিতে আমরা দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছি। এখন সেই জমি নিয়েই নানা ধরনের অপপ্রচার ও হয়রানির শিকার হচ্ছি। আদালতের প্রতি আমাদের পূর্ণ আস্থা রয়েছে। আমরা চাই, আদালতের মাধ্যমেই প্রকৃত সত্য প্রতিষ্ঠিত হোক। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করে আমাদের বিরুদ্ধে বিভ্রান্তি ছড়ানো বন্ধ হোক।’
সংবাদ সম্মেলনে পরিবারের সদস্যরা জানান, জমির মালিকানা ও দখলসংক্রান্ত দলিল, খারিজ, খাজনা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তাঁদের কাছে রয়েছে। তাঁরা এসব নথি আদালতে উপস্থাপন করেছেন বলেও দাবি করেন। তাঁদের প্রত্যাশা, বিচারাধীন বিষয় নিয়ে কোনো পক্ষ অপপ্রচার কিংবা প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা না করে আদালতের সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে।
একটি জমির বিরোধের আড়ালে যেন চাপা না পড়ে যায় কয়েক প্রজন্মের বসবাসের ইতিহাস, এমন প্রত্যাশাই ব্যক্ত করেন ভুক্তভোগীরা। তাঁদের কাছে এই জমি শুধু সম্পত্তি নয়, এটি তাঁদের শেকড়, স্মৃতি ও বেঁচে থাকার ঠিকানা। তাই কারও প্রতি বিদ্বেষ নয়, সংঘাত নয়; তাঁরা চান কেবল ন্যায়বিচার এবং নিজেদের পৈতৃক ভিটেতে শান্তিতে বসবাসের নিশ্চয়তা।
সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী ১০টি পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।