বাবা, আর মাত্র দুই মাস পরই জেল থেকে ছাড়া পেয়ে বাড়ি ফিরব। মেয়ের মুখে এমন কথা শুনে বাবা ফজল মিয়া হয়তো বুকভরা স্বপ্ন দেখেছিলেন। দীর্ঘ চার বছর পর মেয়েকে আবার কাছে পাবেন, সংসারে ফিরবে হারিয়ে যাওয়া হাসি। কিন্তু সেই ফোনের মাত্র ১৫ দিন পরই পরিবার জানতে পারে, সৌদি আরবে নাকি তাঁর মেয়ের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। অথচ এখনো পরিবার জানে না, সত্যিই কি সিথি আক্তার আর বেঁচে নেই।
টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার বাসিন্দা ফজল মিয়ার পাঁচ মেয়ের মধ্যে সবার ছোট সুইটি আক্তার। পারিবারিকভাবে তাঁর নাম সুইটি আক্তার বলেও জানা গেছে। প্রায় চার বছর আগে দেড় লাখ টাকা ধার করে দালালের মাধ্যমে চাকরির আশায় মেয়ে সুইটি আক্তারকে সৌদি আরবে পাঠিয়েছিলেন দিনমজুর বাবা। প্রথম পাঁচ মাস বাড়িতে টাকাও পাঠিয়েছিলেন। এরপর একদিন ফোন করে জানান, তাঁকে কারাগারে নেওয়া হয়েছে। পরিবারের ভাষ্য, কর্মস্থলে অন্য নারীদের সঙ্গে ঝগড়ার পর তাঁকে ফাঁসিয়ে জেলে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছিলেন সুইটি। এরপর প্রায় এক বছর তাঁর সঙ্গে পরিবারের কোনো যোগাযোগ ছিল না।
পরে আবার জেল থেকে ফোন করেন সুইটি। এরপর প্রায় প্রতি মাসেই পরিবারের সঙ্গে কথা বলতেন। তবে কখনো পরিবারের কাছে বলেননি যে তাঁর বিরুদ্ধে এমন কোনো সাজা হতে পারে। বরং শেষের দিকের ফোনগুলোতে বাড়ি ফেরার কথাই বেশি বলতেন। বাবা ফজল মিয়ার ভাষ্য, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের মাত্র ১৫ দিন আগেও মেয়ের সঙ্গে ফোনে কথা হয়। তখন সুইটি বলেছিলেন, আর দুই মাস পরই হয়তো জেল থেকে ছাড়া পেয়ে বাড়ি ফিরবেন।
কিন্তু সেই আশার মাত্র ১৫ দিন পরই পরিবার শুনতে পায় ভয়াবহ খবর। মানুষের মুখে এবং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম সূত্রে তারা জানতে পারে, সৌদি কর্তৃপক্ষ সুইটির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে পরিবারকে এখনো কিছু জানানো হয়নি বলে দাবি তাঁদের।
বাবা ফজল মিয়ার কণ্ঠে এখন শুধু অসহায়ত্ব। তিনি বলেন, আমার মেয়ের ভাগ্যে কী ঘটেছে আমরা জানি না। সে বেঁচে আছে, না মারা গেছে তাও জানি না। শুধু মানুষের মুখে নানা কথা শুনছি।মা জহুরা বেগমের অপেক্ষা আরও কষ্টের। সুইটির বিয়ে হয়েছিল।
তাঁর চার বছরের একটি মেয়েও রয়েছে। সুইটি সৌদি যাওয়ার পর বড় বোন বিউটি শিশুটিকে নিজের কাছে নিয়ে লালনপালন করছেন। মেয়েকে ফিরে পাওয়ার আকুতি জানিয়ে জহুরা বেগম বলেন, সরকারের কাছে জানতে চাই, আমার মেয়ের কি হয়েছে। আমি আমার মেয়েকে ফেরত চাই। জীবিত হোক, মৃত হোক, আমি আমার মেয়েকে চাই।
স্থানীয় মহেরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বিভাস সরকার নুপুর এবং মির্জাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল মামুনের ভাষ্য, সুইটির বিষয়ে সরকারের কোনো পর্যায় থেকে তাঁদের কাছে কোনো তথ্য জানানো হয়নি। সৌদি আরবে সম্প্রতি দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর সামনে এলেও তাঁদের পরিচয় নিশ্চিত করতে পারেনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ফলে সুইটি আক্তার বা সিথি আক্তার একজনই কি না, বা তার বিরুদ্ধে কি অভিযোগ ছিল, বিচার কিভাবে হয়েছে এবং সত্যিই তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো পরিবারের কাছে অজানা।
সবচেয়ে কষ্টের বিষয়, একজন মা জানেন না তাঁর মেয়ে বেঁচে আছে কি না। একজন বাবা জানেন না মেয়ের শেষ পরিণতি কি। আর চার বছরের শিশুটি জানে না, তার মা আর কোনোদিন তার কাছে ফিরে আসবে কি না। তাই পরিবারের এখন একটাই দাবি, গুজব নয়, তারা সত্য জানতে চায়। তাদের মেয়ে সুইটি জীবিত থাকলে তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হোক। আর যদি সত্যিই তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়ে থাকে, তাহলে কি অভিযোগে, কি বিচারপ্রক্রিয়ায় এবং কখন তাঁর সাজা কার্যকর হয়েছে, সে বিষয়ে পরিবারকে সরকারি ও নির্ভরযোগ্যভাবে জানানো হোক।
কারণ সুইটি শুধু একজন প্রবাসী নারী নন। তিনি একজন বাবার আদরের মেয়ে, একজন মায়ের সন্তান এবং চার বছরের একটি শিশুর মা। তাঁর জীবনের শেষ পরিণতি নিয়ে পরিবারকে অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখে দেওয়া যেন আরেকটি শাস্তি।